পরিবেশ সুরক্ষায় আইনের দুর্বলতা

Sun, Dec 24, 2017 4:43 PM

পরিবেশ সুরক্ষায় আইনের দুর্বলতা
  • ড. রেবা মণ্ডল       

আমাদের চারপাশে যা কিছু আছে তাই নিয়ে আমাদের পরিবেশ। অর্থাৎ প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং মানুষের তৈরি পরিবেশ সৌরজগতের প্রাণের অস্তিত্ব সম্পন্ন এই গ্রহটির সার্বিক পরিবেশ ও প্রতিবেশ নিয়ন্ত্রণ করছে। ভূগোলবিদ KR Dikshit-এর ভাষায় মানুষ যেখানে বসবাস করে তার গুণাগুণ, শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য বায়ু, খাদ্য, পানি, অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সম্পদ প্রভৃতি পরিবেশের অন্তর্ভুক্ত। মানুষ বর্তমানে পরিবেশের অন্যতম নিয়ন্ত্রক সেহেতু সময়ের সঙ্গে মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কার্যাবলী যুক্ত হয়ে বিবর্তিত পরিবেশ সৃষ্টি করে। মানুষসহ প্রতিটি জীবই পরিবেশের অন্যতম উপাদান এবং মানুষসহ কোনো প্রাণীই পরিবেশের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া ছাড়া বেঁচে থাকতে পারে না। কাজেই পরিবেশের প্রভাব সব প্রাণীর ওপরই অনস্বীকার্য।

সম্প্রতি পৃথিবীব্যাপী পরিবেশের গুরুত্ব উপলব্ধি করে পরিবেশ সংরক্ষণে মানব সভ্যতা অধিকতর সচেতনতা অবলম্বন করতে শুরু করেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কনভেনশন যেমন- মানব পরিবেশবিষয়ক জাতিসংঘ সম্মেলনের ঘোষণা- স্টকহোম ১৯৭২, প্রকৃতির জন্য বিশ্ব সনদ ১৯৭২, জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক জাতিসংঘ ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন ১৯৯২, কিয়োটো প্রটোকল ১৯৯৭, ওজোন স্তর সংরক্ষণে ভিয়েনা কনভেনশন ১৯৮৫, ওজোন স্তর ক্ষয়কারী লীগ সম্পর্কিত মন্ট্রিল প্রটোকল ১৯৮৭, ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্যরে আন্তঃরাষ্ট্রীয় চলাচল ও অপসারণ নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত ব্যাসেল কনভেনশন ১৯৮৯, দীর্ঘস্থায়ী জৈব রাসায়নিক ক্ষতিকর পদার্থ সংক্রান্ত স্টকহোম কনভেনশন ২০০১ ইত্যাদিসহ আরও অনেক কনভেনশনের পাশাপাশি পৃথিবীর রাষ্ট্রগুলো নিজ উদ্যোগে পরিবেশ সংরক্ষণে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক আইন ও নীতিমালা গ্রহণ করেছে।

পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫, পরিবেশ আদালত আইন ২০১০, বিলুপ্তকৃত পরিবেশ আদালত আইন ২০০০, শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০০৬, ইট পোড়ানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন ১৯৮৯, ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০০৫, মহানগরী বিভাগীয় শহর ও জেলা শহরের পৌর এলাকাসহ দেশের সব পৌর এলাকায় খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান এবং প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন ২০০০ এবং পরিবেশ সংশোধিত আইন ২০১০ সহ এসব নানা ধরনের পরিবেশবান্ধব আইন ও নীতিমালা পাস ও গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশও পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার চেষ্টা করছে। তারপরও বাংলাদেশে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে দুঃখজনকভাবে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে একদিকে প্রাকৃতিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড প্রাকৃতিক পরিবেশকে ক্রমাগত বিপর্যস্ত করে তুলছে।

সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে তেলবাহী কার্গো ট্যাঙ্কার দুর্ঘটনায় বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট প্রাকৃতিক পরিবেশের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিতে বাংলাদেশসহ বিশ্ব পরিবেশবাদীদের উদ্বিগ্ন ও আহত করেছে। প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ পাইপ ফেটে অনেক সময় পরিবেশ দূষিত হয়। অথচ দ্রুত গ্যাস পাইপ মেরামত করতে দেখা যায় উদাসীনতা। শিল্প ও কল-কারখানার বর্জ্য, জ্বালানিজনিত কার্বন নির্গমন, বৃক্ষ নিধন ও প্রাকৃতিক জলাধার ধ্বংস করে মরুকরণ প্রক্রিয়া প্রাণীর জীবন ধারণের ওপর বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করে চলেছে। পাশাপাশি দুর্ঘটনাজনিত পরিবেশ বিধ্বংসী প্রতিকূল অবস্থায় দেশের মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদসহ অন্যান্য জীববৈচিত্র্য যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও ব্যবস্থাপনা মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। আমাদের দেশে পরিবেশ বিধ্বংসী যেসব দুর্ঘটনা ঘটছে তার পেছনে অন্যতম কারণগুলো হচ্ছে দুর্ঘটনা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার অপ্রতুলতা, দক্ষ জনবল ও প্রযুক্তির অভাব, দায়িত্বে কর্মরত ব্যক্তিবর্গের দায়িত্বহীনতা, আইনগত দুর্বলতা ও শাস্তি প্রয়োগের দীর্ঘসূত্রিতা এবং পরিবেশ উন্নয়ন ও সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতার অভাব। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ অনুযায়ী দেশে পরিবেশ অধিদফতর নামে একটি অধিদফতর গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি পরিবেশ আদালত আইন ২০১০ সংসদ কর্তৃক ১১ অক্টোবর ২০১০ তারিখে রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভ করেছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আইন ১৯৯৫-এর ৪ ধারা অনুযায়ী এ আইনের বিধান সাপেক্ষে, পরিবেশ সংরক্ষণ, পরিবেশগত মান উন্নয়ন এবং পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও প্রশমনের উদ্দেশ্য সমীচীন ও প্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত সব রকম কার্যক্রম গ্রহণ করা যাবে এবং কার্যক্রম সম্পাদনের উদ্দেশ্যে যে কোনো ব্যক্তিকে প্রয়োজনীয় লিখিত নির্দেশ অধিদফতর কর্তৃক প্রদান করা যাবে। তবে ক্ষমতা ও কার্যাবলীর ধারা ৪(১), ৪(২), ৪(৩)-এর অধীনে কোনো সময়সীমা নির্ধারিত নেই পরিবেশের উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম গ্রহণ করার। ৪(২) (জ) উপধারায় পানীয় জলের মান পর্যবেক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা ও রিপোর্ট প্রণয়ন এবং সংশ্লিষ্ট সব দিকে পানীয় জলের মান অনুসরণে পরামর্শ বা ক্ষেত্রগত নির্দেশ প্রদান অথবা ৪(৩) (খ)-এর শর্ত অনুযায়ী কোনো ক্ষেত্রে পরিবেশ দূষণের কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে অধিদফতর জরুরি বিবেচনায় তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতে পারে পরিবেশ আদালতের ৪ ধারার অধীনে। কিন্তু সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি কর্তৃক মামলা করার কোনো বিধান নেই। জেলা পর্যায়ে পরিবেশ আদালত রয়েছে সেটি অনেকেরই অজানা। সাধারণ বিচারিক আদালত এবং পরিবেশ আদালত এক হয়ে মিশে আছে পরিবেশ আদালত আইন, ২০১০ -এর ধারা ৪-এর ২ নং উপধারা মোতাবেক। ধারা ৪(২) এ বলা হয়েছে, একজন বিচারকের সমন্বয়ে পরিবেশ আদালত গঠিত হবে এবং সরকার, সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে, যুগ্ম-জেলাজজ পর্যায়ের একজন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাকে ওই আদালতের বিচারক নিযুক্ত করবে এবং উক্ত বিচারক তার সাধারণ এখতিয়ারভুক্ত মামলা ছাড়াও পরিবেশ আদালতের এখতিয়ারভুক্ত মামলাসমূহের বিচার করবেন। কিন্তু পরিবেশবিষয়ক মামলা গ্রহণ ও বিচারকার্য অস্পষ্টতার আবর্তে ঘুরপাক খেতে বাধ্য হয়। জনগণের অধিকার নেই পরিবেশ আদালতে গিয়ে পরিবেশ দূষণ কিংবা পরিবেশের মান ক্ষুন্ন হলে ন্যায়বিচার পাওয়ার। পরিবেশ আদালত আইন ২০১৩-এর ৬ ধারামতে পরিবেশ আইনে বর্ণিত সব অপরাধের বিচারের জন্য পরিবেশ অধিদফতরের মহাপরিচালকের বা তার কাছ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি স্পেশাল মেজিস্ট্রেট আদালতে সরাসরি মামলা দায়ের করতে পারবেন বা থানায় এজাহার দায়ের করতে পারবেন। অর্থাৎ এ ধারা থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান জনগণের সরাসরি পরিবেশ আদালতে মামলা করার অধিকার নেই। শুধু মহাপরিচালক বা তার ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধির সরাসরি মামলা করার অধিকার রয়েছে। তাই আমরা মনে করি জনগণ বা সাধারণ মানুষ যদি সরাসরি পরিবেশ আদালতে মামলা করতে না পারে তাহলে পরিবেশ রক্ষা করা আদৌ কী সম্ভব! জীববৈচিত্র্য বা অন্যান্য প্রাণীকুলের জীবন ও পরিবেশ সুরক্ষা কেবল মানুষই দিতে পারে। সেক্ষেত্রে জনসাধারণের সম্পৃক্ততায় সরাসরি মামলা করার অধিকার না থাকা পরিবেশ আইনের দুর্বলতাই বলতে হয়। আবার দুর্নীতির কারণেও অধিদফতর কর্তৃক তদন্ত রিপোর্ট প্রদানে স্বচ্ছতা থাকে না বলে পরিবেশবাদীরা মনে করেন। এছাড়া পরিবেশ আইন ভঙ্গের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তির যে বিধান রয়েছে তাও ক্ষেত্রবিশেষ যথেষ্ট নয়। প্রাকৃতিক পরিবেশের চলমান দুর্দিনে মানবসৃষ্ট পরিবেশ দূষণের জন্য আরও কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

বর্তমানে পরিবেশ উন্নয়নে আগের চেয়ে বিশ্বব্যাপী সুবাতাস বইছে। একসময় পরিবেশ নিয়ে মানুষের এত বেশি মাথাব্যথা ছিল না। সভ্যতার ক্রমবিকাশে মানুষ সৌন্দর্য সচেতন হচ্ছে, জীবন ধারণে রুচিশীল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে অগ্রসর এবং স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হচ্ছে বলেই প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে মানবসৃষ্ট পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার প্রতি গুরুত্বারোপ করছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিগত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, দায়ীত্বশীলতা ও দেশপ্রেমের মাধ্যমেই দেশ ও মানব উন্নয়নে পরিবেশ রক্ষায় ঐক্যবদ্ধভাবে রাষ্ট্র ও সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। যথাযথ আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের মাধ্যমে মানুষ, প্রাণী ও উদ্ভিদকুলের অস্তিত্ব রক্ষায় অর্থাৎ পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখতে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।


লেখক : শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট, আইন বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
 


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
উপরে যান