শিশুশ্রম ও বাস্তবতা

Sun, Dec 24, 2017 4:51 PM

শিশুশ্রম ও বাস্তবতা

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও’র পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্বে প্রায় ১৬ কোটি ৮০ লাখ শিশু নানাভাবে শ্রম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছে। এদের মধ্যে প্রায় সাড়ে আট কোটি শিশু নানারকম ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত। ‘জাতীয় শিশু শ্রম জরিপ-২০১৩’ অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় ৩৪ লাখ ৫০ হাজার শিশু কোনো না কোনো শ্রমে নিয়োজিত। এর মধ্যে ১২ লাখ ৮০ হাজার শিশুই বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। শিশুশ্রম নিরসনে বাংলাদেশ সরকার ৩৮টি ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম নির্ধারণ করে ২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধের অঙ্গীকার করেছে। যদিও সরকার ২০১৬ সালের মধ্যে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নির্ধারণ করেছিল । কিন্তু আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে তা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশে শিশুশ্রমের প্রথম এবং প্রধান কারণ হচ্ছে অর্থনৈতিক। দরিদ্র পরিবারের পক্ষে ভরণপোষণ মেটানো সম্ভব হয় না। এ পরিস্থিতিতে বয়সের কথা বিবেচনায় না রেখেই বাবার পেশায় বা অন্য কোনো পেশায় সন্তান যদি নিয়োজিত হয় তাহলে বাবা-মা একে লাভজনক মনে করেন। শিশুদের স্বল্পমূল্যে দীর্ঘক্ষণ কাজে খাটানো যায় বলে নিয়োগকর্তাও শিশুদের কাজে নিয়োগে বিশেষ উত্্সাহী থাকেন।

শিশুশ্রমের আরেকটি অভিশপ্ত দিক হলো, কর্মের প্রলোভন দেখিয়ে একশ্রেণির প্রতারক একটি শিশুকে ঘর থেকে বের করে গ্রাম থেকে শহরে এবং অবশেষে শহর থেকে বিদেশে পাচার করে অমর্যাদাকর কাজে ব্যবহার করে থাকে। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থাও শিশুশ্রমের অন্যতম একটি কারণ। পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, সম্পদের অসম বণ্টন, কর্মসংস্থানের অভাব, সামাজিক অনিশ্চয়তা ইত্যাদি কারণে গ্রাম থেকে শহরমুখী মানুষের স্রোত দিন দিন বাড়ছে। এ ছাড়া নদী ভাঙন, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটছে অহরহ। এ জাতীয় প্রতিটি ঘটনা-দুর্ঘটনাই প্রতিনিয়ত শিশুদের ঠেলে দিচ্ছে কায়িক শ্রমের দিকে। শিক্ষা উপকরণ ও সুযোগের অভাব এবং শিশুশ্রমের কুফল সম্পর্কে অভিভাবকদের অসচেতনতাও শিশুশ্রমকে তীব্রতর করছে। শহুরে জীবনে কাজের লোকের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতার গতানুগতিক সংস্কৃতিও শিশুশ্রমকে উসকে দিচ্ছে। শ্রমজীবী শিশুরা নেই কোথায়? চায়ের দোকান থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস, রেস্তোরাঁ, পরিবহণ গ্যারেজ, ফার্নিচারের কারখানা, জুতার কারখানা, ট্যানারি শিল্প, তামাক শিল্প, আবর্জনা সংগ্রহ, ওয়েল্ডিং-এর কারখানা, ইটের ভাটা পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে শিশুরা উত্পাদন প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত। শ্রমজীবী শিশুর পরিসংখ্যান যাই বলুক না কেন, রাস্তায় চলতে গেলে শিশুশ্রমে নিয়োজিত শিশুর দেখা পাওয়া যায়। ধরুন, মহাখালী থেকে মিরপুর, ফার্মগেট থেকে নিউমার্কেট, নিউমার্কেট থেকে জিগাতলা যেসব লেগুনা চলাচল করে তার চালক বা হেল্পার কারা ? এটাকে যদি আমরা একটা সেবা হিসেবে বিবেচনা করি তাহলে দেখা যাবে যে, সেবা প্রক্রিয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শ্রমজীবী শিশুর উপস্থিতিই সিংহভাগ। যা কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়।

আজকের শিশু-কিশোরই হবে আগামীদিনের উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। তাদের উপযোগী করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আমাদের অর্জন আশাপ্রদ নয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর শিশু এবং শিশুর অধিকার সংরক্ষণে প্রবর্তিত হয় শিশু আইন ১৯৭৪সহ নানাবিধ নীতিমালা। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও জাতিসংঘ শিশু-অধিকার সনদ এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার শিশুবিষয়ক অধিকাংশ সনদ অনুসমর্থনসহ শিশু-অধিকার সংক্রান্ত বহু আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক ও দ্বিপক্ষীয় ঘোষণায় বাংলাদেশ অংশীদার।

বাংলাদেশের সংবিধানে শিশুসহ সব নাগরিকের মৌলিক অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি অংশে শিশুদের জন্য বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষাসহ শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। মৌলিক অধিকার অংশে মানুষ হিসেবে সব নাগরিকের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। বিশেষত জবরদস্তিমূলক শ্রম পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার ক্ষেত্রে আইনগতভাবে প্রতিকার পাওয়ার নিশ্চয়তা রয়েছে।

বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ৩য় অধ্যায়ে ধারা ৩৪-৪৪-এ কিশোর এবং শিশু নিয়োগ সংক্রান্ত আইন অনুযায়ী আনুষ্ঠানিক কর্মক্ষেত্রে কোনো শিশুর নিয়োগ রহিত করা হয়েছে। আরো বলা হয়েছে, সরকার কর্তৃক সময় সময় গেজেট বিজ্ঞপ্তির দ্বারা নির্ধারিত ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশু-কিশোরদের নিয়োগ দেয়া যাবে না। তবে ক্ষেত্রবিশেষে চিকিৎসক কর্তৃক প্রত্যয়নকৃত হলে শিশু বা কিশোরকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য শর্তাধীনে নির্ধারিত হালকা কাজ দেয়া যেতে পারে।  সুস্থ ও স্বাভাবিক শৈশবের নিশ্চয়তা সব শিশুর জন্মগত অধিকার। শিশুর এ শাশ্বত অধিকার থেকে আমাদের দেশের বহু শিশুই বঞ্চিত। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য পারিবারিক, সামাজিক, জাতীয়-আন্তর্জাতিক উদ্যোগের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা, শিল্প-কারখানা স্থাপন ও উত্পাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা গেলে ঝুঁকিপূর্ণ ও নিকৃষ্ট ধরনের শিশুশ্রমসহ সব ধরনের শ্রম থেকে শিশুদের প্রত্যাহার করা সম্ভব হবে। তবেই আমাদের শিশুরা আগামীতে আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে।

লেখক : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
উপরে যান