সাজ্জাদ রাহমানের ‘ছায়া দেয়াল: ভয়ঙ্কর অশরীরী আত্মার গল্প

Wed, Jan 17, 2018 8:02 PM

সাজ্জাদ রাহমানের ‘ছায়া দেয়াল: ভয়ঙ্কর অশরীরী আত্মার গল্প
  • নিতাই বাবুঃ

অনেক বড় গ্রাম। গ্রামটিতে রাস্তাঘাট, খালবিল, ডোবানালা  আর শখানেক পুকুর। নানারকম গাছগাছালির বাগান, আর জঙ্গলে ভরা। জঙ্গলের পাশেই একটা জঙ্গলবাড়ি। বাড়িটি দেখতেও ভয় হয়। বিশাল বড় বাড়ি। জনশূন্য, বাড়িটিতে কোনও মানুষের বসবাস নেই। বাড়িটি সবসময় কেমন যেন খাঁ খাঁ করে। কেউ যেন বাড়িটির সামনে ডাকে। রাত্রিবেলা যেমন ঝিঁঝিঁপোকার ডাক শোনা যায়, বাড়িটার সামনে গেলে দিনের বেলায়ও তেমন ঝিঁঝিঁপোকার ডাক। গ্রামার কেউ ভয়ে ঐ বাড়িটির সামনে দিয়েও হাটে না।

অনেকবার অনেকে ভয় পেয়ে রোগশোকে মৃত্যুবরণও করেছে। গ্রামের মানুষদের এমনিতেই ভূতপ্রেতের ভয় বেশি থাকে। সন্ধ্যার পর গ্রামের রাস্তাঘাট থাকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। শহরের মতন গ্রামে তেমন আলোর ব্যবস্থা নেই। কোনও কোনও গ্রামে বিদ্যুতের ব্যবস্থাই নেই। অন্ধকারে অন্যকিছু দেখলেও ভূত বলে চিৎকার করে। গ্রামের মানুষের ভূতের উপর বিশ্বাস বেশি। তাই ঐ জঙ্গলবাড়ির সামনে দিয়ে কেউ যায় না। মানুষের আনাগোনা না থাকার কারণে, জঙ্গলবাড়িটা একেবারেই অপরিষ্কার। চারদিক গাছগাছালি জঙ্গল আর জঙ্গল।

পুরাতন দেয়ালে শেওলা পড়তে পড়তে, দেয়ালে অনেক বটবৃক্ষেরও জন্ম হয়ে গেছে। দেখে মনে হয়, এগুলো যেন মানুষ নিজ হাতে রোপণ করে রেখেছে। তাই বাড়িটার চারদিকের প্রাচীরে বটগাছের শিকড়ে আচ্ছন্ন। জঙ্গলবাড়িটা বহু পুরানো বাড়ি। এই বাড়িটি কোনো এক সময় এক জমিদারের ছিল। সেই আমলের বুড়াবুড়ি না থাকার কারণে, বাড়িটির প্রকৃত মালিক সবার কাছেই অপরিচিত। আর প্রকৃত মালিকের নামও অজানা। এটি কার বাড়ি, এই বাড়িতে কে এবং কারা বসবাস করতো তাও কেউ বলতে পারে না। বাড়িটির এমন অপরিচ্ছন্ন অবস্থা দেখে, কোনও কবিরাজও এই বাড়িটির ভেতরে প্রবেশ করে না। মোটকথা, বাড়িটি গ্রামের সবার কাছে ভূতুড়েবাড়ি আর জঙ্গলবাড়ি নামেই পরিচিত। বাড়িটির গেইট, দরজা জানালা সবই আছে। নেই শুধু বসবাসকারী।

গ্রামের কারোর গরুছাগল, হাঁস মুরগি হারানো গেলেও, এই বাড়ির সামনে গিয়ে কেউ আর খোঁজ করেনা। বাড়িটি নিয়ে কেউ তেমন কোনও গবেষণাও করে না। গ্রামের অনেকের আত্মীয়স্বজন শহরে বসবাস করে। শহরে থেকে লেখাপড়া শিখে বিদ্বানও হচ্ছে। কেউ বছরে একবার আসে, কেউ বার বছরেও আসে না।

হঠাৎ একদিন এক বিদ্বান ছেলে ছুটি কাটাতে গ্রামে আসে। ছেলেটার বাপদাদার প্রিয় গ্রাম হলেও, ওর জন্ম শহরে। ছোট থেকে বড় হয়েছে, শহরে। বর্তমানে গ্রামে বাপদাদার বাড়ি না থাকলেও, আত্মীয়স্বজনের অভাব নেই। দুঃসম্পর্কের এক ঘনিষ্ঠ চাচার বাড়ি আছে। শহর থেকে কেউ খুব একটা আসে না। কিন্তু ছেলেটার মন চায় গ্রামে যেতে।

শহরের চার দেয়ালের ভেতরে যাদের চিরস্থায়ী বসবাস, তাদের তখন গ্রাম দেখার খুবই সাধ। সেই কারণে বিদ্বান ছেলেটি ছুটিতে এসেছে গ্রামে। কলেজের গ্রীষ্মকালীন ছুটি। লম্বা ছুটি। প্রায় ১৫/২০দিন। গ্রামে গিয়ে ঘুরবে, দেখবে, আড্ডা দিবে। আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে থাকবে। এভাবনা নিয়েই এসেছে ছেলেটার নিকটাত্মীয় চাচার বাড়িতে। গ্রামে আসার সাথে সাথে সমবয়সী অনেকের সাথে পরিচয় হয়ে যায়। পরিচয়ের পর শুরু হয় আড্ডা। আড্ডাও সেই জঙ্গলবাড়ির সামনেই। জঙ্গলবাড়ির সামনে দিয়ে বাজারে যাবার রাস্তা। রাস্তার সামনেই খোলা ময়দান। ময়দান মানে, এখানে আগে ছিল এই জঙ্গলবাড়ির বিশাল ফুলবাগান। এখন ফুলবাগান নেই। ময়দানের মতন জায়গাটি এখন আগাছা আর ঘাসের দখলে। বিকালবেলা গ্রামের অনেক ছেলেপেলে এই দূর্বাঘাসের উপরে বসেই আড্ডা দেয়। শহর থেকে আসা শিক্ষিত ছেলেটিও আজ এখানে এসেছে সমবয়সীদের সাথে। কথাবার্তা হচ্ছে শহর নিয়ে। গ্রাম থেকে এখনো অনেক ছেলেপেলে শহরে যায়নি। তাদের কাছে শহরের গল্প শুনতে অনেক ভালো লাগে। লাল নীল বাতির গল্প, মটরগাড়ি ছুটে চলার গল্প, বড়বড় মার্কেটের গল্প, সিনেমা দেখার গল্প ইত্যাদি ইত্যাদি।

গল্প বলতে বলতে একসময় শহরের শিক্ষিত ছেলেটির নজর পরলো ঐ জঙ্গলবাড়ির দিকে। এতক্ষণ কথার ধান্ধায় এই ভূতুরেবাড়ির দিকে আর নজর পড়েনি। বাড়িটার সুন্দর কারুকার্য দেখে শহুরে ছেলেটা বারবার বাড়িটার দিকেই তাকাচ্ছে। ওর এভাবে বাড়িটার দিকে তাকানো সাথে থাকা গ্রামের ছেলেদের পছন্দ হচ্ছে না। একজন জিজ্ঞেস করলো, 'ওইদিকে কী দেখছিস?'
_না মানে বাড়িটা দেখছি।
_বাড়িটা দেখতে হবে না। এই বাড়ির দিকে বেশি তাকালেও সমস্যা হবে।
_কেন?
_কেন টেন বুঝি না। শুধু একটুখানি বুঝি, এই বাড়িটা হলো ভূতুড়ে বাড়ি।
_ভূতুড়ে বাড়ি মানে?
_আ-রে বাবা ভূতের বাড়ি, ভূতের। বুঝলি?
_আমি এখনো কিছুই বুঝিনি। আমাকে বোঝাতে হবে। ভূত বলতে এই পৃথিবীতে কিছু নেই। কিছু নেই মানে হচ্ছে, এই ভূত নামের কোনও কিছুর অস্তিত্বই নেই।
_পাগলের প্রলাপ!  বলে কী? আ-রে ভাই, এই বাড়িতে এখন কেউ না থাকলেও ভূত থাকে। অনেকেই দেখেছে, অনেকেই ভয়ে আক্রান্ত হয়ে মারাও গেছেন।
_আমি এই ভূত টুত কিছু বুঝি না। বিশ্বাসও করি না। আমাকে দেখতে হবে।
_আ রে রাখ, তোর দেখাদেখি! এসব নিয়ে মাথাও ঘামাবি না কোনওসময়।
_আচ্ছে তোরা এখানে যারা আছিস, তোরা কি কখনো ভূতপ্রেত দেখেছিস?
_আমাদের দেখতে হবে না বাবা, দেখলে আর ঠিক থাকতে পারবো না। তবে মানুষকে যে ভূতে ধরে, তা একশো পার্সেন্ট নিশ্চিত। তোরা শহুরে পোলাপান, তোরা সবসময় থাকিস চার দেয়ালের মাঝে বন্দি। তাই তোদের কাছে ভূতপ্রেত সম্পর্কে এক বানানো গল্প। আমাদের গ্রামের এই বাড়িতে আজ পর্যন্ত কেউ ঢুকতে পারেনি। বাড়িটার ভেতরে গানের শব্দ, নাচের শব্দ, কান্নাকাটির শব্দ অহরহই শোনা যায়। যদি ভূতই না থাকতো, তাহলে বাড়ির ভেতরে নাচগান কে করে?
_নাচগান?
_আবার জিগায়! শুধু নাচগান নাকি? কান্নাকাটিও করে।
_তাহলেতো আমাকে আরও বেশি করে ভাবিয়ে তুললি। এই নাচগানের রহস্য আমাকে বের করতেই হবে।
_দেখ বাবা, তোকে এ বিষয়টি নিয়ে আর মাথা ঘামাতে হবে না। তুই আমাদের গ্রামে এসেছিস বেড়াতে। ক'দিন থেকে শহরে চলে যা। এই রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা থেকে বিরত থাক। এই বাড়ির রহস্য উদ্ঘাটন করতে চাইলে, তোর মৃত্যুও হতে পারে। তাতো আমরা কিছুতেই চাই না। চল এবার বাড়ি যাই।

সন্ধ্যার একটু পরে শহুরে ছেলেটা চাচার বাড়ি আসলো। রাতের খাবার সেরে শোবার ঘরে গেল ঘুমাতে। ছেলেটার চোখে ঘুম নেই। শুধু ঐ বাড়িটাই ছেলেটার চোখে ভাসছে। কার বাড়ি? কিসের ভয়? কিসের নাচগান? কে আছে সেখানে? ভূতের নাম শুনেছি, কিন্তু কখনো চোখে দেখিনি। এই বাড়ি হতেই আমি ভূতপ্রেত নিয়ে একটা ধারনা পেতে পারি। এসব নিয়ে ভাবতে ভাবতে চোখ পড়লো খাটের নিচে। দেখতে পেলো একটা লাল রঙের ওড়না। শুনতে পাচ্ছে গানের শব্দ। চমকে ওঠলো ছেলেটা। আবার দেখছে নাই। রাত অনেক। ঘরে একা। সাথে কেউ নেই। কাউকে ডাক দেবার সাহসও পাচ্ছে না। এখন এই ভূতের ডাক্তারেই ভূতের ভয়ে কাঁপছে। খানিক চোখ বুজে থাকে, আবার চোখ মেলে দেখে। ভাবছে ছেলেটা এটা কী? তাহলে আসলেও ভূত বলতে কোনও অস্তিত্ব আছে? কিন্তু বিজ্ঞানতো এসব বিশ্বাস করে না। বিজ্ঞানীরা বলে আসছে, ভূত বলতে কিছু নেই। এখন আমি স্বচক্ষে কী দেখলাম? এভাবেই এসব নিয়ে ভাবতে ভাবতে শেষরাতের দিকে একটু ঘুমিয়েছিল ছেলাটা।

সকাল পেরিয়ে দুপুর ঘনিয়ে এলেও, ঘুম ভাঙছে না ছেলেটার। এদিকে গ্রামের সমবয়সী ছেলেরা ওকে না দেখে অস্থির। এক ছেলে ওর চাচার বাড়ি গিয়ে জিজ্ঞেস করলো, 'ও কোথায়?' উত্তর পেলো, এখনো ঘুমাচ্ছে।
_কী ব্যাপার! দুপুর হয়ে যাচ্ছে, অথচ এখনো ঘুমাচ্ছে? দেখিতো!
ঘরে গিয়ে দেখে ঠিকঠিক ঘুমাচ্ছে। বিভোর ঘুম। অনেকক্ষণ ডাকাডাকির পর শহুরে ছেলেটার ঘুম ভাঙলো।
_কিরে, এতো ঘুম?
_হ্যা দোস্ত, অনেক রাতে ঘুমিয়েছিতো তাই।
_ওঠ, হাত মুখ ধুয়ে নেয়। তোকে নিয়ে বাইরে যাবো।
_এখন কয়টা বাজে?
_হুম, এখনতো দুপুর বারোটা।
_তাহলেতো এখন আর বাইরে যাওয়া যাবে না। খানিক পর গোসল করে খাওয়াদাওয়া করবো। বিকালবেলা তোরা আমার এখানে আছিস, কথা আছে। যাও এখন বাড়ি যাও। এই বলেই গ্রামের ছেলেটাকে বিদায় দিলো। গাও গোসল সেরে দুপুরে খাওয়াদাওয়া সেরে, একটু বিশ্রাম নিয়ে বাড়ির বাইরে গেলো। রাস্তায় সমবয়সী সবাই ওর জন্যই অপেক্ষা করে বসে আছে। ওকে নিয়ে সমবয়সীদের মাঝে আজ দুদিন যাবত গবেষণা চলছে।

এমন সময় শহুরে ছেলেটা সেখানে গিয়ে উপস্থিত। ওকে দেখামাত্র সবাই খুশিতে মেতে ওঠলো। ছেলেটা বললছে, আমি তোমাদের জঙ্গলবাড়ির রহস্য বের করতে চাই। আমাকে তোমরা একটু সাহায্য করবে। আমি আজ রাতে ঐ জঙ্গলবাড়িতে ঢুকবো। তোমরা সবাই বাড়ির বাইরে থাকবে। থাকবে এই কারণে যে, আমার কোনও সমস্যা হলে, তোমরা একটু তাড়াতাড়ি করে আমাকে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করবে। শহুরে ছেলেটার কথা শুনে কেউ রাজি হলো, কেউ দ্বিমত পোষণ করলো। অবশেষে সবাই রাজি হলো। কিন্তু যেই ঘনিষ্ঠ চাচার বাড়িতে ছেলেটা বেড়াতে এলো, সেই চাচার পরিবারবর্গ তাকে বারবার নিষেধ করতে লাগলো। কিন্তু না, কোনও ঔষধেই কাজ হচ্ছে না ছেলেটার। সে জঙ্গলবাড়ির ভেতরে যাবেই যাবে। তার এই বাড়ির ভেতরকার রহস্য উদ্ঘাটন করতেই হবে।

বিকাল শেষে সন্ধ্যা হতে শুরু লাগলো। সন্ধ্যা হবার সাথে সাথেই, সবাই যারযার মত প্রস্তুতি নিয়ে রেডি হয়ে আছে। এ ব্যাপারে গ্রামে জানাজানি হয়ে গেল। শহুরে ছেলেটার সমবয়সীদের সাথে যোগ হলো, গ্রামের আরও অনেক মানুষ। সবার মুখে একই কথা, "আজ জঙ্গলবাড়ির ভূত ধরা পরবে। ভূতপ্রেত নাম শুনেছি, চোখে দেখিনি। আজ দেখবো।"
ছেলেটাও ছিল বিষম সাহসী, আর জেদি। যখন যা মনে জাগে, তাই করে ফেলে। তাই এই জঙ্গলবাড়ির ভূতপ্রেত নিয়েও ছেলেটার মাথা ব্যথা। যেই কথা সেই কাজ। ঠিক সময়মত জঙ্গলবাড়ির সামনে ছেলেটা আসলো। ছেলেটা এসেই অনেক মানুষ দেখতে পেয়ে খুবই খুশি হলো। সবার কাছ থেকে বলে কয়ে সাথে একটা টস-লাইট নিয়ে রওনা হলো জঙ্গলবাড়ির দিকে। গ্রামের মানুষ হ্যাজেক-লাইট, মশাল, হারিকেন নিয়ে বাইরে বসে রইলো।

শহুরে ছেলাটা সাহস করে আস্তে ধীরে সেই ভূতুরে বাড়িটার দিকে যাচ্ছে। বাড়ির গেইটের সামনে যেতেই একটা বিড়াল ছেলেটার পায়ের সামনে ঘুরঘুর করছে। এই দেখছে, এই আবার নাই হয়ে যাচ্ছে। বাড়িটার ভেতরে আবার গানের আওয়াজ হচ্ছে। মেয়ে গলার মধুর কণ্ঠে গাওয়া গানের সুর। ছেলেটা শুনছে আর ভাবছে। বাড়ির গেইট থেকে একটু দূরেই জমিদার মহলের দরজা। গেইট পার হয়ে দরজার সামনে গেল ছেলেটা। শেওলায় আচ্ছন্ন বহু পুরানো দরজাটা হাতের স্পর্শেই খুলে গেল। দরজা খুলে যাবার সাথে সাথেই ভেতর থেকে সাঁ সাঁ করে অনেকগুলো নানারকম পাখি উড়ে এলো। ছেলেটা ভীষণ ভয় পেয়ে পেয়েও ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। আস্তে আস্তে ভেতরে যাচ্ছে। মনে ভীষণ ভয়। তবুও যাচ্ছে, এগোচ্ছে সামনের দিকে। যতই যাচ্ছে, ভয় ততই বাড়ছে। ভয়ংকর শব্দ কানে আসছে। মনে হচ্ছে, সামনে পিছনে কেউ যেন দৌড়াদৌড়ি করছে। কিন্তু না, কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। সবই ছায়া, তবে গানের শব্দ আর মিথ্যে নয়। মানুষের হাটাচলার শব্দও মিথ্যে নয়। এভাবেই এগিয়ে চলছে ছেলেটা।

একটা রুমের ভেতরে নাচগানে শব্দ শুনতে পেল। রুমের সামনে যেতেই দরজা ফাঁক হয়ে গেল। ছায়ার মতো দেখতে পাচ্ছে, ভেতরে একজন মদপান করছে। আর আগের রাতে শোবার ঘরে যেই লাল রঙের ওড়নাটি দেখেছে, সেই ওড়নাটি নর্তকীর গায়ে পেছানো। ছেলেটি ঐ ওড়না দেখে আর ভয় পেয়ে গেল। তবু থামছে না ছেলেটা। দেখছে আর সামনে যাচ্ছে। নর্তকীর গান আর নৃত্যে মাতাল হয়ে এদিকওদিক করছে। ছেলেটা যা দেখছে সবই ছায়ার মতন। তবে হুবহু মানুষের মতন। ছেলেটা আস্তে আস্তে সামনে যাচ্ছে। যতই সামনে যাচ্ছে, নাচগানের শব্দ ততই তীব্র হচ্ছে। ধরতে চাচ্ছে, মদ্যপ লোকটিকে। কিন্তু না, ধরা যাচ্ছে না। ছায়া সবই ছায়া। অনেকক্ষণ এই ছায়ার চারপাশ ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলো। মনে তার ভয়ও লাগছে। হঠাৎ একজন লোক ছোরা হাতে এঁদের সামনে এগিয়ে এলো। ছেলেটা দেখছে, আর ভয়ে কাঁপছে। ছোরা হাতে লোকটা এসেই মদ্যপ লোকটিকে খুন করলো। মৃত্যু নিশ্চিত হয়ে নর্তকীকেও ছোরা দিয়ে আঘাত করলো।

এইসব দৃশ্য দেখেই, ছেলেটা দৌড়াচ্ছে। দৌড়াইতে দৌড়াইতে সেই জমিদার মহলের গেইটের বাইরে এসেই ধপাস করে পড়ে গেল। জ্ঞানহীন এক নিথর দেহ জঙ্গলবাড়ির গেইটের বাইরে পড়ে থাকতে দেখে, গ্রামের লোকজন ধরাধরি করে তাকে হাসপাতাল নিয়ে গেল। দুইদিন পর ছেলেটার জ্ঞান ফিরল। সবাই জিজ্ঞেস করছে কী হয়েছিল তার। কিন্তু ছেলেটার মুখে কোনও উত্তর নেই। ছেলেটার তখনো মনের ভেতর থেকে ভয় যাচ্ছে না। সময়সময় ভায়ে কেঁপে ওঠছে। ক্ষণে ক্ষণে শুধু মানুষের মুখের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে। ছেলেটি আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছে ঐ জঙ্গলবাড়িতে যুগযুগ ধরে কিসের আলামত চলছে। আলামত চলছে প্রেতাত্মার আলামত।

প্রেতাত্মা বলতে বোঝা যায়, যেসব আত্মার মৃত্যুর পর কোনও জায়গায় স্থান হয় না; সেসব মৃত আত্মাই প্রেতাত্মা হয়ে দ্বারেদ্বারে ঘুরে বেড়ায়। কখনো গহীন জঙ্গলে, কখনো বড় কোনও গাছের উঁচুতে, কখনো মানুষের উপর ভর করে ঘুরে বেড়ায়। যাদের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়, মৃত্যুর পর সেসব আত্মার একটা নির্দিষ্ট স্থান হয়ে যায়। আর যেসব মানুষের আচমকা দুর্ঘটনাজনিত কারণে মৃত্যু হয়, যেমন: আত্মহত্যা, এক্সিডেন্ট, কারোর আঘাতে বা কেউ মেরে ফেলেছে, এমন। সেসব মানুষের আত্মাই বেশিভাগ প্রেতাত্মা হয়ে দুনিয়া মাঝে ঘোরাফেরা করে। ছেলেটি জঙ্গলবাড়ির রহস্য উদ্ঘাটন করতে পাড়লেও, কিন্তু এখন সে কথা বলতে পারছে না।

ছেলেটা কিছু না বললেও, গ্রামের মানুষের আর বুঝতে অসুবিধা হলো না। ঐ জঙ্গলবাড়ির ভূতেই ছেলেটার উপর সোয়ার হয়েছে। ভূত বলতে কিছু নেই বিজ্ঞান বলে। ভূতের দেখা কেউ প্রমাণ করতে পারেনি, তাই আজও বিজ্ঞানীদের কাছে ভূত অস্তিত্বহীন। কিন্তু এখনো এই দুনিয়ায় প্রেতাত্মার অস্তিত্ব ধরা পড়ে। প্রেতাত্মা বলতে কিছু আছে। যা মানুষের উপর ভর করে বিরাজ করতে চায়। ছেলেটিও ওইরকম প্রেতাত্মা আক্রমণের শিকার। কিন্তু ছেলেটি কারও কাছে মুখ খুলে বলতে পাড়ছে না যে, আমি ঐ জঙ্গলবাড়ির ভূত বা প্রেতাত্মার রহস্য উদ্ঘাটন করতে পেরেছি। ছেলেটি এখন বাকরুদ্ধ।

উপরোল্লিখিত ঘটনাবলী কোনও সত্যিকারের ঘটনা নয়। এই ঘটনাটি ঘটেছে, একটি নাটকে। নাটকটির নাম: ছায়া দেয়াল। নাটকটি ভূতপ্রেত নিয়ে নির্মিত। নাটকটির পরিচালক সাজ্জাদ রাহমান। অভিনয়ে ছিলেন-  শাহরিয়ার শুভ, ইমাম মাহাদী, ইফতি, মোশাররফ হোসেন মনা ও আরও অনকে। চিত্রগ্রহণ করেছেন সোহেল তালুকদার, সম্পাদনা- এনামুল হক। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান- গ্যালাক্সী মিডিয়া।
বর্তমানে নাটকটি ইউটিউবে চলছে। এই নাটকটির বর্তমান ভিউয়ার, তিন লাখের কাছাকাছি। নাটকটির স্টোরি পড়ে যদি ভালো লাগে, তাহলে সবাইকে অনুরোধ করবো নাটকটি উপভোগ করার জন্য।

নিতাই বাবু গোগনাইল, সিদ্ধিরগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ। ১৭/০১/২০১৮ই


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
উপরে যান