হালদায় ডলফিনের মড়ক?

Sun, Jan 21, 2018 9:56 PM

হালদায় ডলফিনের মড়ক?

গত ২৫ দিনে চারটি মৃত ডলফিন ভেসে উঠেছে হালদা নদী ও সংলগ্ন খালে। গত তিন মাসে মারা গেছে মোট ১৬টি ডলফিন।  

মৎসজীবী ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিয়মিত ডলফিন মারা যাওয়ার এ চিত্র ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক’।

ধারণা করা হচ্ছে, নদীতে চলাচলকারী বালু উত্তোলনকারী ড্রেজারের আঘাতেই এসব ডলফিন মারা যাচ্ছে।

ডলফিনের মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে জেলা মৎস্য অফিসের কর্মকর্তারাও মাঠে নেমেছেন।

হালদা নদীতে যে ডলফিনের দেখা মেলে, তা গাঙ্গেয় ডলফিন প্রজাতির। ইংরেজিতে একে বলা হয় Ganges River Dolphin; এর বৈজ্ঞানিক নাম Platanista gangetica । স্থানীয়ভাবে একে বলা হয় হুতুম বা ‍শুশুক।

ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) গাঙ্গেয় ডলফিনকে বিপন্ন হিসেবে লাল তালিকায় রেখেছে। ২০১২ সালের বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের তফসিল-১ অনুসারে এই প্রজাতিটি সংরক্ষিত।

এই প্রজাতির ডলফিন বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের নদীতে দেখা যায়। এরমধ্যে ভারতের গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র, বাংলাদেশের পদ্মা, সুন্দরবনের আশেপাশের নদী এবং চট্টগ্রামের হালদা ও কর্ণফুলী এর  বিচরণ ক্ষেত্র।

শনিবার সকালে হালদা নদী সংলগ্ন গড়দুয়ারা ইউনিয়নের গচ্ছাখালী খালের কান্তর আলী চৌধুরীহাট বাজারের সেতুর নিচে একটি মৃত ডলফিন ভেসে ওঠে। এটি প্রায় ছয় ফুট দৈর্ঘ্যের, ওজন ৭০ কেজির মতো।

স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে বিকালে মৎস্য কর্মকর্তারা সেখানে গেলেও জোয়ারের পানিতে মৃত ডলফিনটি সরে যাওয়ায় সেটি উদ্ধার করতে পারেনি।

হালদা পাড়ের মৎসজীবী কামাল সওদাগর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, মারা যাওয়া ডলফিনে জখমের চিহ্ন ছিল।

“এমনিতেই দিন দিন হুতুম কমে যাচ্ছে। এভাবে হলে আর থাকবে না।”

এর আগে ২৭ ডিসেম্বর গচ্ছাখালি খালের মাস্টার বাড়ি কালভার্টের নিচে, ২ জানুয়ারি গড়দুয়ারা স্লুইস গেট এলাকায় এবং ৫ জানুয়ারি গচ্ছাখালি খালে আরও তিনটি মৃত ডলফিন ভেসে ওঠে।

হালদা বিশেষজ্ঞ এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মনজুরুল কিবরিয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, তিন মাস ১৬টি ডলফিনের মৃত্যুর তথ্য তিনি পেয়েছেন।

তিনি বলেন, “ডলফিনের মৃত্যুর প্রধান কারণ বালু উত্তোলনকারী ড্রেজারের প্রপেলারের আঘাত। গচ্ছাখালি খাল ধরে হালদায় ড্রেজার চলাচল করে। এখানেই প্রপেলারের আঘাতে ডলফিন আহত হয় এবং পরে মৃত অবস্থায় ভেসে ওঠে।”

এই প্রাণী গবেষক বলেন, “এদের চোখ নেই। মূলত ইকো সাউন্ড দিয়ে এরা চলাফেরা ও খাবার সন্ধান করে। এদের শরীরের গঠনও নরম প্রকৃতির। ড্রেজারের প্রপেলার বা অন্য কোনো অংশের আঘাত এরা সহ্য করতে পারে না।”

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির কো-অর্ডিনেটর মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, হালদায় ২০০টির মতো ডলফিন আছে। এরমধ্যে ১৬টি মারা গেল। আগে একসময় কর্ণফুলীতে নিয়মিত ডলফিন দেখা যেত। এখন দেখা যায় না বললেই চলে। এ অবস্থা চলতে থাকলে হালদাও ডলফিনশূন্য হয়ে যাবে।

হালদার ডলফিন রক্ষায় অবিলম্বে নদীতে ড্রেজারে বালু উত্তোলন বন্ধ করা এবং নদীটিকে ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া (ইসিএ) ও ডলফিনের অভয়াশ্রম ঘোষণার দাবি জানান তিনি।

হালদা পাড়ের বাসিন্দা এবং গড়দুয়ারা ড. শহীদুল্লাহ একাডেমির প্রধান শিক্ষক শিমুল মহাজন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, শৈশবে নদীতে নিয়মিত ডলফিন দেখতেন তারা, এখন খুব কম দেখা যায়।

“ডলফিন বাঁচার উপযোগী পরিবেশ পাচ্ছে না। নদীতে ড্রেজার চলে আর মাছ ধরার জন্য কেউ কেউ গোপনে বিষও প্রয়োগ করে।”

হাটহাজারী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আজহারুল আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, শনিবার মাথায় আঘাত পেয়ে মারা যাওয়া সাত কেজি ওজনের একটি বোয়াল মাছ নদী থেকে উদ্ধার করেছেন তারা।

“গত কয়েকদিনে চারটি ডলফিন মারা যাওয়ার তথ্য আমাদের কাছে আছে। এগুলোকে মৃত এবং ফোলা অবস্থায় দেখেছি। নদীতে ড্রেজার চলাচল বন্ধের সুপারিশ আগেই আমরা করেছিলাম।”

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মমিনুল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ড্রেজারের কারণেই ডলফিন মারা যাচ্ছে কি না, সেটা এখনই বলতে পারছি না।

“হাটহাজারী ও রাউজান উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাকে নিয়ে আগামী দুই দিন নদীতে ঘুরে আমরা এর কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করব। তারপর বলতে পারব, কেন ডলফিন মারা পড়ছে।”

চট্টগ্রামের হাটহাজারী ও রাউজান উপজেলা দিয়ে প্রবাহিত হালদা নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ৮০ কিলোমিটার।  হালদার সাথে সংযুক্ত আছে ১৭টি খাল।

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান এই প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র দেশে কার্প জাতীয় মাছের রেনুর প্রধান উৎস। দখল, দূষণ এবং চোরা শিকারির উৎপাতে বিপন্ন হালদার মা মাছও।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
উপরে যান