এক পাগল বন্ধুর গল্প

Tue, Jan 30, 2018 10:11 PM

এক পাগল বন্ধুর গল্প

নিজাম উদ্দিনঃ

আমার কলেজ জীবনের বন্ধু কাঞ্চন। একসাথে লেখাপড়া, গান কবিতা আর আড্ডা। তখন ১৯৯৩। চৌমুহনী এস, এ, কলেজে বি, কম ভর্তি হয়েছি। তারও আগে ওর সাথে পরিচয় মাইজদীতে এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। আবৃত্তি করতো ও। আমার বেশ মনে পড়ে একদিন আমাদের বাসায় এলো ও হাতে একটা কবিতার বই নিয়ে। আমার একচিলতে কামরার চৌকির এক কোনে বসে ও আবৃত্তি করলো কালো মেয়ের জন্য পংতিমালা কবিতাটি। তারপর বেশ হাসলো। ওদের বাসা ছিলো চৌমুহনী কলেজের পেছনে প্রফেসরস্ কোয়ার্টারে। কোয়ার্টার বলতে টিনের বেড়া দেওয়া চৌচালা ঘর, সামনে বেড়া দেওয়া ফুলের বাগান।

ওর বাবা ছিলেন আমাদের স্যার, বাংলার অধ্যাপক। আমায় ভীষণ ভালোবাসতেন। ভালোবাসতো ওর মা, ছোটো আরো তিন ভাই বোনেরাও। কাঞ্চনের তখন চুরুটের নেশা ছিলো প্রবল। গান পাগল, কবিতা পাগল বন্ধু পাগল এক অকৃত্রিম বন্ধু কাঞ্চন। গৌর বর্ণের সুন্দর চেহারা, ডাগর কালো চোখ, বড়ো বড়ো চোখের পাঁপড়ি, ভুরুজোড়া বেশ সুন্দর। ওর হাসি ছিলো হা হা করা দম ফাটানো আর একটা বিনয়ি মুচকি হাসিও ওর ঠোঁটের কোনে লেগে থাকতো এমনকি ঘুমুলেও। উজ্জল দাঁত ও সরু নাক। বুকের ময়দানে একটা কালো গভীর অরণ্য ছিলো মানে এক রাশ কালো লোম। সকলের মধ্যমনি ছিলো ও। সকলের মাঝেই ও গান ধরতে পারতো নিঃসংকোচে। দরাজ গলায় গাইতো, ময়ূরপঙ্খী রাতেরো নিড়ে,, আকাশে তারাদের ঐ মিছিলে ,,,তুমি আমি আজ চলো চলে যাই,,,শুধু দুজনে মিলে , গানটি।

আমিও মাইজদী থেকে কলেজে গেলে ওদের বাসায় আড্ডায় বুঁদ হয়ে যেতাম। ফিরতে ইচ্ছে করতোনা বাড়ি। ওদের ভালোবাসায় আমি ভুলেই যেতাম আমার বাড়ি ফেরা। রেখে দিতো আমায়, থেকে যেতাম। মাঝে মাঝে ওর পাখি শিকারের বন্দুক নিয়ে ভোর বেলায় বেরিয়ে পড়তাম পাখি শিকারে। দু তিনদিন যাওয়াই হতোনা বাড়ি। একদিন দেখি বাবা এসে দাঁড়িয়ে আছেন কলেজ পাড়ায় ওদের গেটে আমাকে নেবার জন্য।

এরকম বহুবার হয়েছে। যেতে হতো অনেক কস্ট নিয়ে কেঁদে এবং কাঁদিয়ে। প্রতিশ্রুতি দিয়ে যেতে হতো আবার আসবো আবারো থাকবো। এ ভাবেই বেশ ক' বছর। তারপর পাশ করে বেরিয়ে গেলাম তবুও যাওয়া আসা থামেনি। একদিন শুনলাম স্যার মারা গেছেন। ওরাও বাসা বদল করে কোথায় গেছে জানিনা, খুঁজে পাইনি কোনোদিন প্রিয় বন্ধুকে, সব কিছু এলোমেলো হয়ে গেলো। হয়তো ততোদিনে তাদের জীবনে হয়তো কোনো বড়ো ঝড় বয়ে গেছে। জানিনা। সম্ভবত ১৯৯৬ সালেই ছিলো ওদের সাথে শেষ দেখা, আর দেখিনি। আজ দেখলাম ২২ বছর পর। বার লাইব্রেরীতে বসে বন্ধু মাহমুদ ভাই সহ চা খাচ্ছিলাম। হঠাৎ দরোজার ওপাশে দেখি একটা পাগল আমাকে দেখে নেচে উঠলো। হ্যাঁ পাগলইতো। মনোযোগ দেবার কোনো মানেই হয়না। চা শেষ হতে না হতেই ও আমার সামনের চেয়ারের পাশে এসে দাঁড়ালো। বল্লো, তুমি নিজাম। বলেই হাসতে লাগলো চিৎকার করে। সেই দিক্ চূর্ণ করা হাসি, আমি তখনো চিনতে পারিনি, পাগলটার চোখ কি রকম রুক্ষ আর ক্রুদ্ধ, চুল গুলো লম্বা আর এলোমেলো, শিরদাঁড়া বেরিয়ে আছে, বুকের পাঁজর গোনা যায়। ওকে শান্ত হতে বলে চেয়ারে বসিয়ে চা আনালাম। দুচুমুক দিয়েই ভুলে গেছে বাকিটুকু খেতে ।

ও আমার মা বাবা ভাই বোন সবার কথা জিজ্ঞেস করলো। কথা বলতে বলতেই আবার সেই গান সেই কবিতা, হা হা হাসি। ক্রুদ্ধদৃষ্টিতে ও সবাইকে দেখছে, চোখ শূন্যে রেখে ও কাকে যেনো গালাগাল করে উঠলো। বল্লাম কার উপর এতো রাগ, এতো ক্ষোভ? ও বল্লো, নিজের উপর নিজাম নিজের উপর, মানুষের উপর। ততক্ষণে অনেক উকিল মোয়াক্কেল জড়ো হতে লাগলো। আমাদের আলাপচারিতায় চা ওয়ালা, বাদাম ওয়ালা, কিছু ভিক্ষুক, অবুঝ বালক, দারোয়ান পিয়ন জড়ো হতে লাগলো হাসাহাসি আরম্ভ করলো। আমি ওকে নিয়ে উঠে এলাম আমার আরেক সিনিয়র কলিগের চেম্বারে, একটু নিরাপদে।

চেম্বার ফাঁকাই ছিলো ভাগ্যিস। মুখোমুখি বসলাম। মোবাইল ফোন থেকে আমার পরিবারের ছবি ওকে দেখালাম। ওকে বুকে জড়াতে চাইলাম। ও বল্লো,"না"। তারপর অঝোরধারায় পাগলের মতো কাঁদতে লাগলো আমিও কাঁদলাম। দু একজন খুব অবাক হয়ে দেখছে, ভাবছে পাগলের সাথে পাগল। ও বল্লো ও একদিন আমাদের বাসায় যাবে, দেখে আসবে সবাইকে, সালাম করে আসবে আম্মাকে ইত্যাদি ইত্যাদি। তারপর অনুমতি চাইলাম ওর কিছু ছবি তোলবার। বলতেই ও বল্লো, এভাবে তোলো ওভাবে তোলো, আমার শক্ত শিরদাঁড়ার ছবি তোলো, আমার বুকের পাঁজরের ছবি তোলো, ওটা এখন শূন্য ওখানে আর প্রেম নেই মমতা নেই, আমার শক্ত চোয়ালের, কিটমিটে দাঁতের, মুখ ভেংচির আমার ঘৃণার, শক্ত শিরা উপশিরার ছবি তোলো। আর কতো তুলবে আর কতো? দেখো আমি কিরকম পাগল তোমার বন্ধু কাঞ্চন। হা হা হা। তারপর ও বেরিয়ে গেলো একটা ঘুমন্ত কুকুরকে লাথি দিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে। চোখের সীমানা পার হতে হতে ওর হারিয়ে যাওয়া ঠায় দাঁড়িয়ে দেখলাম।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
উপরে যান