সাজ্জাদ রাহমান এর গল্প ‘কর্পোরেট ভালোবাসা’

Sat, Feb 3, 2018 5:17 PM

সাজ্জাদ রাহমান এর গল্প ‘কর্পোরেট ভালোবাসা’

অফিস থেকে ফিরেই শফিক কিচেনে ঢোকে। বাজারটা রেখে বেডরুমে। সেখান থেকে প্যান্ট শার্ট ত্যাগ করে লুঙ্গী পরে। সেখান থেকে ওয়াশরুমে।গামছা ভিজিয়ে পুরো শরীর মুছে নেয়। জুলাইয়ের গরমে বেশ ঘাম দিচ্ছিলো। হাতমুখ ধুয়ে আবার কিচেনে। ভাত রান্না করতে হবে। তা’নাহলে উপোস পেটেই রাত পার করতে হবে। কিন্তু সেটা সম্ভভ নয়, খিদাটা বেশ জানান দিচ্ছে। চাইলেই হোটেলে বসে কিছু খেয়ে নিতে পারতো। কিন্তু তাও ইচ্ছে করেনি। নিজেকে শাস্তি দেয়ার এ একটা উপায়, না খেয়ে থাকা।রাত দশটা পর্যন্ত শাস্তি দিয়েছে, এখন আর ইচ্ছা করছেনা। কারণ শরীরটা দূর্বল লাগছে। চাল ধুচ্ছিলো।

মনে পড়লো ক’দিন আগের এক বিকেলে ডেস্কে বসে কাজ করছিলো শফিক। মাঝে মাঝে আড়চোখে ফোনের দিকে তাকাচ্ছিলো সে। মেসেজটা তখনি এলো।শরিফা লিখেছে-
খুব ক্ষিধে লেগেছে।কিছু খাওয়াও
শফিক লিখলো- কি খাবে বলো?
পিজা খাবো।

শফিক আর দেরি করলোনা। বাইরে এসে দ্যাখে ঝুম ঝুম বৃষ্টি।বৃষ্টির মধ্যেই নিজেকে অবাক করে দিয়ে রাস্তায় নেমে গেলো। ওপাশের একটা দোকানে ছোট সাইজের পিজা পাওয়া যায়। প্যাকেটটা হাতে নিয়ে এক রকম ছুটতে ছুটতে শরিফার সামনে। শরিফা দেখে বললো-
সেকি ভিজতে গেলে কেন?
কিছু হবেনা। নাও.. আমার হাতে অনেক কাজ।
তুমিও শেয়ার কর আমার সাথে।
আমি খেয়েছি, তুমি খাও।

শরিফার টেবিলে পিজার প্যাকেটটা রেখে অফিসের বারান্দায় গিয়ে সিগারেটে টান দিতেই পেটটা চিন চিন করতে শুরু করলো।তবুও আলাদা একটা প্রশান্তি কাজ করেছিলো মনে। অনেকটা যুদ্ধ জয়ের তৃপ্তির মতো।
শরিফা ছিলো তার ফেসবুক ফ্রেন্ড। বাড়ি কুড়িগ্রাম।চ্যাট করতে বসে একদিন জানালো ওর মন ভালো নেই। একটা চাকুরি না হলেই নয়। বাবা অসুস্থ, চিকিৎসা করার টাকা নেই। শরিফাই পরিবারের বড়ো সন্তান, সুতরাং সে কিছু করতে পারছেনা একারণে তার মনটা ভালো নেই।শফিক জানালো সে চেষ্টা করে দেখবে।

ক’দিন পরেই অফিসের সার্কুলারটা হলো। একাউন্টস-এ একজন লোক লাগবে। দেরি না করে সে তার বস এর সাথে দেখা করলো।মোবাইল থেকে ছবিটাও দেখালো শরিফার। বস বললেন সিভি দিতে। শফিক তখনি ফোন দিলো। পরদিন শফিকের মেল এড্রেসে শরিফার সিভি এলো, তাও স্ক্যান করা। শফিক ফোন দিয়ে বলল সফ্ট কপি লাগবে। শরিফা আবারও পাঠালো। খুব সাদামাটা একটা বায়োডাটা। কোনো এক্সপেরিয়েন্স নেই, এমনকি কম্পিউটার লিটারেসিও নেই। টেনসনে পড়ে গেলো সে। তারপরও দুরু দুরু বুকে বসের হাতে দিলো সিভিটা। বস খানিকটা পড়ে শফিককে ফেরত দিলেন। বললেন- হবেনা। শফিক অনেক অনুনয় বিনয় করলো। বলল- মেয়টা তার কাজিন। তার বাবা বিছানায় শয্যাসায়ী, আয় রোজগারের সে ছাড়া আর কেউ নেই। চাকুরিটা না হলে মেয়েটার বাবা বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে। বস কি মনে করে যেন সিভিটা রাখলেন, ইন্টারভিউ দেয়ার জন্যে ডাক পেলো শরিফা।


ইন্টারভিউ যেদিন সেদিন অফিসের সামনের একটা চা দোকানে বসে চা খাচিছলো শফিক। দেখলো অফিসের সামনে একটা মোটর সাইকেল এসে দাঁড়িয়েছে। একটা তরুণ ছেলের পেছনে শরিফা। শফিক অর্ধেক চা রেখে একরকম দৌড়ে এসে দাঁড়ালো শরিফার সামনে। সেখান থেকে সরাসরি বসের চেম্বারে।

শরিফার ইন্টারভিউ শেষে বসের সাথে দেখা করলো শফিক। কিন্তু বস এর থমথমে চেহারা। শরিফাকে বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে বস বললেন-
ও ইংরেজিতে ভীষণ দূর্বল, তাছাড়া একাউন্টিং এর কোনো টার্মই ঠিকমতো জানেনা। ওকে নিলেতো এমডি আমাকে শোকজ করবে। শফিক ভাবলো হাল ছেড়ে দিলে চলবেনা।
শফিক পারেতো বস এর পা ধরে। অনেক অনুনয় বিনয় এর পর বস রাজি হলেন। চাকুরিটা হয়ে গেলো শরিফার।
কিন্তু সমস্যা দাঁড়ালো ঢাকায় এসে সে উঠবে কোথায়? শরিফা জানালো তার এখানে আত্মীয় বলতে তেমন কেউ নেই। অনেক ভেবে শফিক জানালো আপাততঃ তার বাসাতেই উঠতে পারে। তারপর দেখে শুনে যে কোনো একটা হোস্টেলে সিট নেয়া যাবে। শরিফাও রাজি হলো। আপাততঃ বাড়ি চলে গেলো সে।
সেদিন থেকে ফোনে আর এফবিতে প্রতিদিন; বলা যায় সারাদিন কথা হতো ওদের। অজানা কারণে শফিকের ভীষণ খুশী লাগছিলো। এক বেডের ফ্লাটে থাকে শফিক। ভাবলো শরিফা এলে বেডটা ওকে ছেড়ে দিয়ে সামনের রুমে সোফায় ঘুমাবে সে। বাড়িওয়ালাকে বলবে আপন ছোট বোন। ওয়াশরুমের তোয়ালেটা পুরনো হয়ে গেছে। মার্কেটে গিয়ে বেশ দাম দিয়ে একটা তোয়ালে কিনলো। সেই সাথে সাবান, শ্যাম্পু, টুথপেষ্ট। শরিফা জানালো ওয়াশরুমে যেন একটা নারিকেল তেল থাকে। তাও কিনলো।

শরিফাকে জিজ্ঞেস করলো সে এখানে আসার পর কি কি খাবে? শরিফা জানালো গরুর মাংস তার খুব পছন্দ। ভালোইতো, শফিকেরও গরুর মাংস পছন্দ। প্রতিদিন শুধু মাংস নিশ্চয়ই খাওয়া যাবেনা। সুতরাং বিভিন্ন পদের মাছ এর তালিকাও নিলো।

জয়েনিং এর ডেট যতোই ঘনিয়ে আসছিলো, শফিকের মনে একটা চাপা উত্তেজনা কাজ করছিলো। কিন্তু ঢাকায় আসার একদিন আগে শরিফা যা জানালো সেজন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলোনা সে। শরিফা জানালো সে তার আম্মার এক কাজিনের বাসায় উঠবে। যাই হোক কি আর করা। শফিক ভাবলো- শরিফা হয়তো তার সাথে একা বাসায় উঠতে আনইজি ফিল করছিলো। যে কারণে উঠেনি।


জয়েনিং এর দিন শরিফা এলো, তাও অন্য একটি ছেলের মোটর সাইকেলে। শফিকের বিষয়টা ভালো লাগলোনা, কিন্তু শরিফাকে বুঝতে দিলোনা। কারণ শরিফা তার এমন কেউ নয় যে জবাবদিহি করবে।

এরপর প্রায় ওরা দুপুরে কেন্টিনে বসে খায়, কখনো বিকেলের নাস্তাটাও এক সাথে। শরিফা জানালো ডেইলী-ডেইলী শাড়ি পরতে ভালো লাগেনা। শফিক শরিফাকে মার্কেটে নিয়ে ক‘টা থ্রি পিস কিনে দিলো পছন্দমতো। সেদিন রাতে ওরা এক সাথে বসে ডিনারও করলো। শরিফা কেমন যেন গাঢ় চোখে তাকালো শফিকের চোখে। এমন করে কোনো নারী বহুদিন শফিকের চোখে তাকায়নি।
সেদিন বাসায় ফেরার পর মোবাইলে প্রায় সারা রাত কথা হলো ওদের। শরিফা বেসুরো গলায় গাইলো। তাও ভালো লাগলো শফিকের। শরিফা জানালো তার ফেলে আসা জীবনের গল্প।

স্কুল লাইফ থেকে একটা ছেলের সাথে বন্ধুত্ব ছিলো শরিফার। তারপর প্রেম। জানাজানি হয়ে গেলে দুই পরিবার মেনে নিলোনা। একদিন পালালো দু’জন।  ক‘দিন এখানে সেখানে ঘুরে বেড়ালো। এক সময় দুই পরিবার মিলে ফোন করে জানালো তারা যেন ফিরে আসে। ফিরলে ওদের বিয়ে দেয়া হবে। গ্রামে ফেরার পর শরিফার পরিবার জানালো ওর পড়াশোনা শেষ করার পরই যেন বিয়ে হয়। কিন্তু কিছুদিন যাওয়ার পর দুই পরিবারে নানা বিষয় নিয়ে বাধলো ঝগড়া। ওদিকে শরিফার পেটে তার প্রেমিকের বাচ্চা।শরিফা বিয়ের জন্যে চাপ দিলো, ছেলেটাও তার পরিবারের চাপে পড়ে নানান গড়িমশি। শেষে ক্লিনিকে গিয়ে বাচ্চাটা ফেলে দিলো শরিফা। সম্পর্কটাও ভেঙ্গে গেলো। শরিফা খেলো বিষ, কিন্তু পরিবার ওকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ায় জীবনটা বেঁচে গেলো ঠিকই, কিন্তু গ্রামের মানুষের কানাকানিতে শরিফা দু’চোখে অন্ধকার দেখতে লাগলো। সেই অন্ধকার জীবনে আলো হয়ে এলো শফিক।

শফিকেরও একটা অতীত আছে। প্রেম করে বিয়ে করেছিলো। একটা ছেলেও হয়েছিলো। কিন্তু সংসারটা বেশীদিন টিকলোনা। একই ছাদের নীচে আলাদা থাকতে থাকতে এক সময় বাধ্য হলো ডিভোর্স নিতে। সেই থেকে শফিক একাই থাকে ঢাকায়। আর তার সাবেক স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে থাকে মফস্বলে। শফিক মাসে মাসে খরচ পাঠায় ছেলের জন্যে।

শরিফাকে পেয়ে শফিক যেন নতুন করে জীবন ফিরে পায়। স্বপ্ন দ্যাখে দু’জনে বিয়ে করবে, একটা সংসার হবে ওদের। দু’জনার উপার্জনে খুব সুন্দর চলে যাবে। শরিফাও সায় দেয়। বলে- একটা বছর অপেক্ষা কর। কেননা, তিক্ত অতীত এখনও তাকে তাড়া করে ফেরে। শফিকও মেনে নেয়। এই এক বছর না হয় প্রেমই করলো। তারপর মালাবদল।

একদিন সকালবেলা ডেস্কে বসে কাজ করছিলো শফিক। ইন্টারকমে বস তাকে চেম্বারে যেতে বললেন। শরিফ দ্রুত চেম্বারে এসে ঢুকলো। সালাম দেয়ার পর বসতে বললেন বস। শরিফ বসলো। বস বেল টিপে পিওনকে চা দিতে বলল। শফিক একটু অবাক হলো। হঠাৎ বসের এই খাতির যত্ন দেখে। বস বললেন – শরিফাকে কতটুকু চেনেন আপনি? শফিক যতোটুকু পারলো ভালোই বলল। কিন্তু তার অতীতটা ছাড়া। ইতিমধ্যে চা এলো। চা খেতে খেতে বস বললেন- ওর নাম্বারটা দিয়েনতো। শফিকের বুকের ভিতরটা খচ করে উঠলো। বস বললেন- আমার এক ফ্রেন্ড আছে। সংসারে শান্তি নেই। এই মাঝে মধ্যে গপসপ করবে আর কি। শফিককে তার বন্ধুর নাম্বারটা একটা নোটপ্যাডে লিখে দিয়ে বললেন- নাম্বারটা শরিফাকে দিবেন। আর বিষয়টা কারও সাথে শেয়ার করবেননা যেন। শফিক শরিফার মোবাইল নাম্বার লিখে সালাম দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে এলো।

কেন জানি তার বুকটা শুকিয়ে আসছিলো শফিকের। পা‘গুলো যেন কেমন শক্তিহীন হয়ে যাচ্ছে। দু’জনেই একই বসের আন্ডারে চাকুরি করে। বসের কথা না শুনলে তিনি অসন্তুষ্ট হবেন। স্ত্রী সন্তান হারিয়ে যখন সে উদভ্রান্তের মতো ঘুরছিলো, তখন এই মিজান সাহেব তাকে চাকুরিটা দিয়েছিলো। অন্যদিকে শরিফাকেও বলা যায় অনিচ্ছা সত্বেও এমডি সাহেবকে ম্যানেজ করে চাকুরিটা নিয়ে দিয়েছেন। কথা না শুনলে দু’জনারই বিপদ। শরিফাও কি মনে করবে কথাটা জেনে। কিন্তু তাকে না বলে থাকাও সম্ভব নয়। ভীষণ মন খারাপ করে শরিফার সামনের চেয়ারে গিয়ে বসলো। ও তখন কম্পিউটারে অফিসের জটিল হিসাব মিলাতে ব্যস্ত। গোলাপি থ্রী পিসটায় শরিফাকে অসম্ভব সুন্দর দেখাচ্ছিলো।


শরিফা এমনিতেই ভীষণ সুন্দরী। বলা যায় নজর কাড়া। ও আসার পর থেকে জোয়ান বুড়ো সবাই কারণে অকারণে তার চারপাশে ঘুরঘুর করে। শরিফাও জানি কেমন। সবার সাথেই সমানভাবে মেশে। পিওন দারোয়ান থেকে সিনিয়র অফিসার, সবাই তার ভক্ত। গণহারে সবার সাথে মেলামেশাটা শফিকের একটুও ভালো লাগেনা। এনিয়ে একদিন রীতিমত কথা কাটাকাটি। শরিফার বক্তব্য- সবার সাথে মিশলেই যে প্রেম হয়ে যাচ্ছে সেটাতো না, এ ক্ষেত্রে শফিকের যুক্তি- অপ্রয়োজনে এতো মেশারই বা কি দরকার? একটু রিজার্ভ থাকলে কি হয়? কিন্তু শরিফা সেটা মানতে নারাজ। মাঝে মাঝেই বিভিন্ন জনের সাথে কেন্টিনে খেতে দেখেছে সে। একজন বলল- কার সাথে যেন মোটর সাইকেলে ঘুরতেও দেখেছে। কিন্তু এসব নিয়ে বেশী তর্ক করলে পাছে সম্পর্কটা নষ্ট হয়ে যায়। তাই শফিক খুব একটা ঘাটাতোনা। কিন্তু আজতো স্বয়ং বসের বন্ধুর চোখ পড়েছে। লোকটাকে চেনা আছে শফিকের। গ্রুপ অব কোম্পানীর জি এম। গাড়ি বাড়ি টাকা পয়সার কমতি নেই। সেই সাথে পাড় মাতাল । প্রায়শঃই পড়ে থাকে বারে। এই লোকটার পাল্লায় পড়লে শরিফা নিজেকে কতখানি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে, সেটাই ভাবছিলো সে। এক সময় শরিফার কথায় চমকে ওঠে।
কি হলো? বসে আছো যে? কিছু বলবে?
না মানে, কি করে যে বলি। একটা সমস্যা হয়ে গেছে।
কি সমস্যা?
বস একটা নাম্বার দিয়েছে। তোমার নাম্বারও চেয়ে নিলো?
কেন?
কি বলবো। উনার এক ফ্রেন্ড । মানে আফজাল সাহেব। তিনি তোমার সাথে কথা বলতে চান।
কেন?
না মানে। বুঝতেই পারছো, গেঁজাতে চায় আরকি।
খেয়ে আর কাজ নাই মানুষের। তুমি বেশিক্ষণ বসে থেকোনা। লোকজন সন্দেহ করবে।
অন্যরাও তো বসে থাকে তোমার সামনে। তখন কারও মনে বুঝি সন্দেহ জাগেনা।
না। কারণ ওরা ফ্রেন্ডলিভাবে মেশে। আর তুমিতো প্রেমিক। তোমার চোখে মুখে প্রেম। এটা বোঝা যায়।
কই, আমিতো এমন কিছু করিনি কখনো।
এখন এতো কথা না বলে যাওতো। অফিস ছুটি শেষে ওই রেস্টুরেন্টটাতে এসো।
ঠিক আছে। নাম্বারটা কি রাখবে? না ফেলে দিবো।
তোমার ইচ্ছা। আমার কোনো ইন্টারেস্ট নেই।
শফিক ভাবলো যদি বস আবার শরিফাকে জিজ্ঞেস করে তখন ঝামেলা হবে। তাই সে কাগজটা শরিফার টেবিলে রেখে চলে যায়। শরিফা আবারো কম্পিউটারে মনযোগ দেয়।

শফিক মনে মনে খুশী হয় বসের বন্ধুকে নিয়ে শরিফার নির্লিপ্ত ভাব দেখে। সে বারান্দায় গিয়ে আয়েশ করে একটা সিগারেট ধরায়। শরিফা আসার পর থেকে এই চেনা পুরনো অফিসটাও প্রতিদিন কেমন যেন নতুন লাগে শফিকের কাছে। প্রতিটা দিন যেন ঈদের দিন। ইদানীং শরিফার জন্যে বাসা থেকে এটা সেটা রেঁধে আনে। হোস্টেলে রাতের বেলা রান্নায় শরিফার ভীষণ অস্বস্তি। শুধু ভাতটা রাঁধে। শফিকও খুশী মনে নিয়েছে দায়িত্বটা। সকাল বেলা অফিসে ঢুকতে চকোলেট কিংবা ফল নিয়ে ওঠে। কখনো ছানার সন্দেশ। প্রতিটা আইটেম শরিফার পছন্দের। একদিন ওর জন্যে কিছু না নিয়ে উঠলে ভীষণ অপরাধী লাগে নিজের কাছে। মনে হয় কোন একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়ে গেছে। মাঝে মাঝে রাজধানীর এখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায় ওরা। কখনো শপিং করে, কখনোবা মুভি দেখে।

শরিফার মেস বাসাটা অফিসের কাছেই। ওরা তাই একটু দূরে গিয়ে রিক্সায় ওঠে। আবার এলাকায় আসলে আগে থেকে রিক্সা থেকে নেমে যায় শফিক, অফিসের কারো চোখে যেন না পড়ে।


এরই মধ্যে রোযার ঈদ এসে যায়। শফিক কিছু কিনে দিতে চায়। কিন্তু শরিফা নেয়না। বলে টাকাটা ক্যাশ দাও, নিজের মতো করে কিনে নেবো। খুব ইচ্ছে করছিলো শরিফাকে কুড়িগ্রাম পৌঁছে দিয়ে আসে, কিন্তু শরিফা না করলে সেটা আর হয়ে ওঠেনা। কিন্তু শফিকের মন পড়ে থাকে শরিফার কাছেই।

রোযার ঈদ শেষে দেখা হলে শরিফা বায়না ধরে শফিকের বাসায় যাবে। শফিকও খুব খুশী। এক উইকেন্ড এর সকালে রিক্সায় নিয়ে আসে শরিফাকে। বাসায় ঢুকে শরিফাকে একটু আনমনা দেখা যায়। এদিক ওদিক দেখছে। শফিক জিজ্ঞেস করে-
কি দেখছো?
না। দেখছি ক্যামেরা ফিট করে রাখোনিতো?
ক্যামেরা ফিট করবো কেন?
না। আজকালকার ছেলেরা অনেক শয়তানতো তাই।
শফিক হাসে।
আমাকে দেখে এই মনে হলো তোমার?
না.. তুমিতো একটা ইনোসেন্ট বয়।
শরিফা শফিকের কাছে ঘনিয়ে আসে। এতো কাছে যে শফিক এর মুখে শরিফার নিঃশ্বাস এসে পড়ছিলো। নিজের অজান্তেই শফিকের বাম হাতটা শরিফার কোমরে। একটু কাছে টানতেই শরিফা এসে পড়ে একেবারে বুকে। এক হাতে সে শফিকের চুলগুলোয় হাত বুলিয়ে বলে-
আমি তোমাকে বিশ্বাস করি। বিশ্বাস করি বলেই একা জেনেও তোমার বাসায় এসেছি। কই আমাকে একটু আদর করবেনা?
শফিকের ঠোঁট যেন সেই আহবানের ইশারার অপেক্ষায় ছিলো। শরিফার নরম ঠোঁটে ডুবে গেলো। তারপর হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলো বেডরুমে। শরিফা বিছানায় গিয়ে বসলো। শফিক দাঁড়িয়ে। দু’জনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ। তারপর শরিফা বালিশ টেনে আলগোছে শুয়ে পড়ে। অচেনা স্বরে বলে-
কই আসো..
শফিক বললো- বাতিটা নিভিয়ে দেই?
শরিফার উত্তর- না, জ্বালানোই থাক ‘


কোরবানীর ঈদের আগে বেশ মোটা অংকের সালামি দেয় শফিক। কথা ছিলো শরিফাকে বাসে তুলে দিবে। কিন্তু সে রাজি হলোনা। পরে শোনে অফিসের এক জুনিয়র কলিগ এর মোটরসাইকেলে বাস স্টপে গিয়েছে সে। শুনে শফিকের বুকটা হাহাকার করে উঠলো। কিন্তু কিছু বললোনা। দেশে যাওয়ার পরও খুব একটা কথা হয়নি। প্রায়ই শরিফা ব্যস্ততার কথা বলছিলো। কখনো বলছিলো সে ঘুমিয়ে ছিলো তাই ফোন ধরতে পারেনি। কখনো চার্জ নেই। আবার বেশীর ভাগ সময় ওয়েটিং। এক ধরণের অস্বস্তির মধ্যেই ঈদটা পার হলো।

ঈদের দুইদিন পর একটা অচেনা নাম্বার থেকে ফোন এলো শফিকের মোবাইলে। ও প্রান্তের মানুষটির পরিচয়- তিনি শফিকের বসের সেই বন্ধু- আফজাল । কুশল বিনিময় শেষে তিনি যে কথাগুলো বললেন, সেগুলি শোনার জন্যে শফিক মোটেই প্রস্তুত ছিলোনা সে।
শরিফাকে কেমন জানেন? ও কেমন মেয়ে?
জ্বী। ভালোই। কেন?
আসলে আপনাকে ধন্যবাদ দেয়ার জন্যেই ফোনটা করা।
কেন?
এই যে আমাদেরকে মিলিয়ে দিলেন। আপনার কারণেই ওর ঢাকায় আসা, তারপর ধরুন এই অফিসে চাকুরি। ও আমাকে সব বলেছে। আমাকে একদিন সময় দিবেন প্লিজ? এক সাথে বসে একটু পানি টানি খাই।
সরি ভাই আমি ওইসব খাইনা।
তাহলে অন্য কিছু খাবেন। ডিনার অথবা লাঞ্চ।
দরকার হবেনা। ধন্যবাদ। আর কিছু বলার থাকলে বলুন।
ঠিক আছে। খোলাশা করেই বলি। আপনার কারণেই আমাদের বন্ধুত্ব, তারপর ধরুন প্রেম। অনেকদূর গিয়েছি আমরা। আমি চাচ্ছি আমাদের বিয়েটা তাড়াতাড়ি হয়ে যাক। কিন্তু ও সময় চাচ্ছে। মিনিমাম এক বছর। বাট, অতোদিন আমি অপেক্ষা করতে চাচ্ছিনা।
তো?
এখন আপনিই পারেন ওকে বুঝিয়ে রাজি করাতে। আমি জানি ও আপনার কথা ফেলতে পারবেনা। ও আপনাকে অনেক শ্রদ্ধা করে।
দেখুন, আপনি হয়তো ভুল করছেন? ওর সম্পর্কে কতটুকুই জানেন আপনি?
ঠিক আছে, আপনিই বলুন না। ও কেমন?
আমি বলতে চাচ্ছিনা। ভালো হয় অন্যভাবে খোঁজ খবর নেন। অন্য কারও কাছ থেকে। বিয়েই যখন করতে চাচ্ছেন, ওর এলাকায় যান, বাড়িতে যান, সেটাই আপনার জন্য ভালো হবে।
ওকে। ঠিক আছে। আপনি তাহলে ওকে এ বিষয়ে কিছু বলতে যাবেন না। আমি দেখছি কি করা যায়।
শফিক নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলোনা। মুহুর্তেই চেনা পৃথিবীটা বড় অচেনা মনে হলো তার কাছে। শরিফাকে ফোন দিলো। শরিফা জানালো সে এখন বাসে। শফিক ভাবলো এখন এ বিষয়ে কিছু বলার দরকার নেই। বেটার সে ফিরে আসুক। কিন্তু নিজের অশান্তিটাও দূর করতে পারছিলোনা। রাতে কয়েকবার ফোন করার পর ধরলো শরিফা। শফিক গড়গড় করে বলেই ফেলল বিষয়গুলো। শরিফা হাসলো। বলল- ‘যার বিয়ে তার খবর নাই, পাড়া পড়শীর ঘুম নাই।’
তোমার বাস কখন আসবে?
কেন?
তোমাকে রিসিভ করে নিয়ে আসি। এতো রাতে হোস্টেলে না গিয়ে আমার এখানেই উঠতে পারো। সকালে চলে যাবে।
না। দরকার হবেনা।
পরদিন অফিসে শরিফাকে অনেক গম্ভীর দেখালো। শফিক ডেস্কের সামনে আসার পর বলল
আমার কাছে আপনার বেশ ক’টা বাটি রয়ে গেছে। ওগুলো নিয়ে যাবেন।
আপনি করে বলছো যে?
এগুলো রেখে কি হবে? আর এখন থেকে আমার জন্যে কিছু আনার প্রয়োজন নেই। অফিসের লোকজন হাসাহাসি করছে।
মানে কি?
যা বলছি তাই করেন। আর আমার সামনে অতোবার আসার দরকার নেই।
কেন?
আপনার এতো কেনর উত্তর দিতে পারবোনা। আপনার মোবাইলটা আমাকে দিনতো
কি করবে?
কাজ আছে।
কি কাজ শুনি?
ফেসবুকের চ্যাট কনভারসেশানগুলো মুছতে হবে।
তুমি কি চাচ্ছো বলতো?
আমি চাচ্ছি আপনি আমার সাথে আর কথা না বলেন। আমিও বলবোনা।
এসব কি হচ্ছে শরিফা?
সরি। আমি আর কথা বলতে পারবোনা। আপনি এখন যান। লোকজন দেখছে।


শরিফা ঘুরে গিয়ে কম্পিউটারে মনযোগ দিলো। শফিক এর পা গুলো যেন আর চলছিলোনা। হাটুতে শক্তি খুঁজে পাচ্ছিলোনা সে। টলতে টলতে ডেস্কে এসে বসলো। অঙ্কে বরাবর কাঁচা শফিক কোনো হিসাবই যেন মেলাতে পারছেনা। মাথাটা ভীষণ ঘুরছে। চোখ মুখ বুক সমানে জ্বালাপোড়া করতে থাকে তার। অফিসের ওয়াশরুমে ঢুকে মুখ ধুলো, ঘাঁড় মুছলো, মাথার তালুটাও ভিজিয়ে দিলো পানি দিয়ে। তবুও উত্তাপ যেন কিছুতেই কমছেনা। আবার এসে বসলো ডেস্কে। ইন্টারকমটা বেজে উঠলো। ওপাশে শরিফা।
আপনি মেসেজগুলো ডিলেট করেছেন?
না। করবোনা।
শোনেন। আপনি কিন্তু নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনছেন। আপনি যদি আমার কথা না শোনেন আমি কিন্তু সিন ক্রিয়েট করবো। আমার কিন্তু মান সম্মানের ভয় নাই। আপনি হয়তো জানেন না, আমি ক্ষেপে গেলে কি করতে পারি।
তুমি বলবেতো কেন মুছতে হবে?
আমি কোনো কৈফিয়ত শুনতে চাইনা। আপনাকে বলেছি মুছতে, মুছবেন ব্যাস।
খট করে ফোনটা রেখে দেয় শরিফা।
সেদিন সারা রাত ঘুম হলোনা শফিকের। রাত বারোটার দিকে নিজের অজান্তেই মোবাইলটা হাতে নিয়ে শরিফাকে ফোন দিলো। শরিফার ফোন ওয়েটিং। ঘন্টা খানেক পর চেষ্টা করার পর একই অবস্থা। রাত তিনটায় ফোন দিয়েও সেই ওয়েটিং। চারটায় ফোন দেয়ার পর রিং হচ্ছে কিন্তু পিক করলোনা সে। সকাল নয়টায় ফোন দিলে ধরলো শরিফা।
তোমাকে সারা রাত ট্রাই করেছি, সারা রাত ওয়েটিং
আমার এক ফ্রেন্ড এর সাথে কথা বলেছি। ওর ক্যান্সারতো, তাই সময় দিচ্ছি।
আমি এতোবার ফোন করলাম একটিবার অন্ততঃ ধরতে পারতে।
শোনেন, আমি এখন অফিসে যাচ্ছি। পরে কথা বলবো।
সেদিন কথা বলতে একটাই। শফিক তার মেসেজগুলো ডিলেট করেছে কিনা? দুপুরে কেন্টিনে খেতে গেলে দেখা গেলো শরিফা অন্য একটি টেবিলে বসে খাচ্ছে, একা। অন্য সময় কেউ না কেউ একজন থাকতো। শফিকের খুব মায়া হলো। মনে মনে ভাবলো, আচ্ছা ঠিক আছে ও যখন চাচ্ছে মেসেজগুলো ডিলেট করতে, ডিলেট করে দিলেই হয়। এগুলো রেখে আর কাজ কি? যদি সম্পর্কই না থাকে। শফিকের পক্ষেতো আর সম্ভব নয় প্রেমে ব্যর্থ পাড়ার কিশোরদের মতো মেসেজ শো করে কেলেঙকারি বাধাবে। একে একে সব গুলো মেসেজ ডিলেট করলো। তারপর শরিফাকে মেসেজ করলো- অল আর ডিলেটেড। উত্তর এলো- আপনি আর কখনো আমাকে মেসেজ করবেননা, ফোনওনা।
শফিক লিখলো- আমার কি অপরাধ?
ওপারে কবরের নিরবতা।


এক সপ্তাহ হলো ঠিকমতো ঘুম খাওয়া সব হারাম হয়ে গেছে শরিফের। একটা প্রশ্নের উত্তর শুধু খুঁজে ফিরছে, মানুষ কি করে এতো বদলে যেতে পারে। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে আত্মহত্যা করে। কিন্তু বারবারই তার মনে নিজ শিশু সন্তানটার মুখটা ভেসে ওঠে। সে পৃথিবী থেকে চলে গেলে কি হবে ওই শিশুটার। ওর মা তার অল্প আয়ে কতদিন ওকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে। তার খাবার, পোশাক, পড়ালেখার খরচ সবইতো যায় শফিকের কাছ থেকে। এই ভেবে সে বাবরবার মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসে, ডুব দেয় আবারো সেই মৃত্যু যন্ত্রণায়।


এক রাতে ফেসবুকে বসে নানা জনের সাথে হাই হ্যালো চলছিলো। দেখলো বেশ পুরনো এক বন্ধু অনলাইনে। এক সময় তার সাথে ভালো বন্ধুত্ব ছিলো। এটা ওটা বলতে গিয়ে নিজের অজান্তেই মনের সব কষ্টের কথা শেয়ার করলো তার সাথে। সেও সমবেদনা জানালো। বলল- কোনো প্রমাণ থাকলে দাও, আমি চেষ্টা করে দেখতে পারি। কিন্তু শফিক জানে, প্রমাণ দিলেও যে চলে গেছে সে কখনো ফিরবেনা। সে এখন টাকার মোহে অন্ধ। কখনো কখনো টাকা পয়সা মদের চাইতেও খারাপ হয়ে পড়ে, যা কিনা মানুষের নীতি, নৈতিকতা বিবেক সব ধ্বংশ করে ফ্যালে। শরিফার বেলায়ও হয়তো তাই ঘটেছে। স্বল্প আয়ের শফিক এর চাইতে গাড়ি বাড়িওয়ালা আফজাল আজ তার কাছে বেশী কদরের। শফিক বেশ বুঝতে পারলো শরিফা আসলে তাকে নিজের স্বার্থের জন্যেই কিছুদিন ব্যবহার করেছিলো। স্বার্থ পুরণ হওয়ার পর ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। তার সামনে এখন বৃহৎ স্বার্থ। একদিন হয়তো এই স্বার্থও ফুরিয়ে যাবে। জন্মদিনের হিসাবে শরিফা মীন রাশীর জাতিকা। এদের একটা খারাপ বৈশিষ্টের একটা হচ্ছে এরা প্রয়োজন ছাড়া কাউকে কাছে টানেনা, আবার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে ছুঁড়ে ফেলে দিতেও দ্বিধা করেনা। এরা সিঁড়ি ভেঙ্গে উপরে উঠতে থাকলে পেছেনের সিঁড়ি কখনো মনে রাখেনা।


যে অফিসটা মাত্র কিছুদিন আগেও পরম আনন্দের জায়গা ছিলো, সেটি এখন শফিকের কাছে নরকের মতো। প্রতিদিন যথানিয়মে অফিসে যাচ্ছে, শরিফার সাথে দেখাও হচ্ছে, কিন্তু কোনো কথা হচ্ছেনা। শফিকের বুকের ভিতরে দোযখের আগুন জ্বললেও শরিফার ইদানিংকার বেশভূষা, অভিব্যক্তিতে মনে হচ্ছে তার এখন ফাগুন দিন চলছে। শরিফার টেবিলের পাশ দিয়ে যাবার সময় আড়চোখে মাঝে মাঝে তাকিয়ে দ্যাখে শফিক। এতো দূর থেকেও কড়া পারফিউমের গন্ধ ভেসে আসছে। কি অবলিলায় মেয়েটা হাসিখুশী ভাব নিয়ে আছে। সারাক্ষণটা ফোনটা কানে না হয়, হাতে। নিজেকে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছিলো শফিক। কিন্তু ঘূণাক্ষরেও সে ভাবেনি সুন্দর এই কাল সাপটা ফণা তুলে এবার তার দিকে তেড়ে আসবে।


শফিক জানতোনা বন্ধু ভেবে বসের ঘনিষ্ঠ সেই মেয়েটার সাথে কষ্টের কথা শেয়ার করে কি বোকামিইনা সে করেছে। মেয়েটি হয়তো তার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়েই বসের সাথে শফিকের কষ্টের কথা বলেছিলো। আর বসও হয়তোবা শরিফাকে নিজ বন্ধুর স্বার্থেই জিজ্ঞেস করেছিলো শফিক এর সাথে তার কোনো সম্পর্ক আছে কীনা। এক্ষেত্রে যার যেই প্রকৃত স্বভাব সে সেটাই করেছে। শরিফা সম্পূর্ণ অস্বীকার করলো। একই সাথে শফিককে ফোন দিয়ে শুরুতেই অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ। যার শুরুটা ছিলো এইরকম.. ‘ওই খানকির ছেলে.. তুই নাকি বলেছিস আমি তোকে চুদেছি.. এখন বল আবার তোকে কখন চুদবো.. বাইরে চুদবো.. নাকি অফিসের ভিতরে বহাইয়া?’


শরিফের বস কিংবা বসের বন্ধুর বোধশক্তি লোপ পেলেও শফিকের বোঝার বাকি রইলোনা সে কত বড়ো বাঁচা গেছে। শরিফার চেহারায় আভিজাত্য কিংবা সৌন্দর্য্রে আড়ালে ঢাকা থাকলেও তার ভেতরটা মূলতঃ নোংরা। সাধারণতঃ বেশ্যাপাড়া কিংবা বস্তির মেয়েরা এ ধরণের কথা বলে থাকে। সুতরাং এটা খুবই পরিস্কার। শরিফা নামক মেয়েটা অনেক ঘাটের পানি খাওয়া মেয়ে। একজনের গল্পই শুধু হয়তো সে বলেছে, তার ঝুলিতে খুব সম্ভবতঃ আরও অনেক গল্প আছে, যা শফিক কিংবা তার বস এর সেই বন্ধুর অজানা। মনে মনে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দেয় শফিক। অন্ততঃ এই কারণে যে- ঈশ্বর চাননি বলেই শরিফার মতো কূলটা মেয়ে জীবন সঙ্গী হয়ে আসেনি।


নিন্মচাপটা কাটলো তবে বেশ সময় নিয়ে। একদিন বিকেলে আবারও বসএর চেম্বারে ডাক। এবার আর বস তাকে বসতে বললেননা। তাকে বেশ গম্ভীর দেখালো। তিনি বেশ বিরক্তি নিয়েই বললেন-
দেখুন, আমি চাইনা আপনি আর কখনো শরিফার মুখোমুখি হন। ওর অন্য জায়গায় চাকুরি হয়ে গেছে, সে চলে যাচ্ছে। কিন্তু ও যাবার আগে অফিসে কোনো সিনক্রিয়েট হোক সেটা আমি চাইনা। আর সিনক্রিয়েট হওয়া মানেতো বুঝতেই পারছেন- আপনার চাকুরিটা যাবে।
সেই থেকে শরিফার মুখোমুখি হয়না শফিক। আজও সে দুপুরে অফিসের খাবার ঘরে যায়নি, না খেয়েই থেকেছে সারাটা দিন। কারণ, তা কেবলি মনে হচ্ছিলো- খাবার ঘরে যাওয়ার পথে একটা নাগিনী ফণা তুলে বসে আছে।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
উপরে যান