জহির হক’ এর গল্প ‘মনের বনে জোছনা’

Mon, Feb 5, 2018 11:50 AM

জহির হক’ এর গল্প ‘মনের বনে জোছনা’
মানুষ এত অভিমানী, এত ইমোশনাল, এত চাপা হয় সজলকে না দেখলে বিশ্বাসই হবেনা। উপরে উপরে দেখাবে খুবই শক্ত মনের, কথা বার্তায় চাল চলনে। সত্যিকারের সজল এ না, এত আবেগ প্রবন মানুষ আর হয়না। মনের অলিন্দে লুকিয়ে রাখে সব আবেগ, অভিমান, ভালোবাসাকে। শায়লাও মাঝে মাঝে তাকে বুঝে উঠতে পারেনা। ঠিক তার বিপরীত, শায়লা কিছুই লুকাতে পারেনা, যতক্ষন সজলকে পেটের কথা বলতে না পারবে ততক্ষন ঘুম নেই, খাওয়া নেই। কিন্তু সজলকে হাজারবার জিজ্ঞেস করলেও কোন আওয়াজ নেই। খুব মন খারাপ হয় শায়লার। বিয়ের পর যখন শায়লাকে ঢাকায় নিয়ে আসে, হ্যা তাইতো অনেকগুলো বছর পেরিয়ে গেছে। বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘ নিশ্বাস অজান্তেই বেরিয়ে আসে। যেদিন অফিস থেকে ফিরতে দেরী হতো শায়লা চিঠি লিখত ঠিক চিঠি বলা ঠিক হবেনা চিরকুট বলাটাই উত্তম। দু লাইন বা চার লাইনের আর সেটা সজলের বুক শেলফ বা কোন একটা শার্টের পকেটে রেখে দিত। ছোট ছোট দুঃখ কথা, না পাওয়ার আকুতি, হাসি, আনন্দ কত ছোট ছোট ঘটনা কিন্তু কি অসম্ভব রকমের ভালো লাগায় ভরিয়ে দিত সজলকে। হঠাৎ বৃষ্টিতে গাছ পালা যেরকম সজীব হয়ে যায় ঠিক সেরকম সজিবতায় ভরিয়ে দিত। সেরকমই একটা চিরকুট বুক শেলফ ঝাড় পোছ করতে গিয়ে আজ খুজে পেল। আরে এ বইটা কতবার পড়েছে তার হিসেব নেই মৈত্রেয়ি দেবীর “ন হ ন্যতে”। কিন্তু ছোট্ট চিরকুটটা কোন ফাঁকে পড়ে আছে, মলাটের সাথে এমনভাবে লেগে আছে চোখে পড়লনাতো।
 
সবুজ কালী দিয়ে গোটা গোটা হাতে লিখা, চিরকুটের ডান পাশে  
 
তারিখঃ ২৩/১০/২০০৩
আজ ডাক্তারের কাছে যাবার কথা ছিল………….
 
ইতি
 
একটা কার্টুনের কাঁদো কাঁদো মুখের ছবি
 
সজলের চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসে কতকাল আগের কথা, এ চিরকুট তার হাতেই পড়েনি, আহারে বেচারী। খিলগাঁর বাসাবোতে ছোট্ট একটা বাসা। ছোট ছোট হাড়ি পাতিল যেন খেলনা বাটির ঘর। কিন্তু কি শান্তি আর সুখ। শুধু একটাই দুঃখ আর না পাওয়ার বেদনা।। কি কষ্ট হতো মুখ ফুটে কিছুই বলতে পারতো না পাছে শায়লা আরো কষ্ট পায়। ঠিক আজকের দিনটিই সে কষ্টের অবসান হলো। পরম করুনাময় অনেকগুলো বছর পর মুখ তুলে চাইলেন। আজ ০৭/০২/২০১৮, ঠিক এ দিনটাতেই হ্যাঁ, এ দিনটাতেই বহু প্রতিক্ষিত সে এলো। যেন সেদিনকার কথা সাতটা বছর হলো। এখন বেচারীর কোন রেস্ট নেই দুই ছেলেকে নিয়ে সারাটা দিন কিভাবে কেটে যায়। দুটো ছেলে নিয়ে নাকে মুখে কয়টা দিয়ে একটাকে মর্নিং শিফট স্কুল আরেকটাকে ডে শিফট। তারপর স্কুল থেকে এসে হোম ওয়ার্ক। সন্ধ্যায় টিচার ওহ। নিজের জন্য কোন সময় নেই। তাই আজকের দিনটা সজল ছুটি নিয়েছে, নিজের হাতে সব করবে। এমনিতেই মাঝে মাঝে ঘরের কাজে সাহায্য করে, অল্প বিস্তর রান্নাটাও পারে। তাই আজ ঘরটা গোছ গাছ করবে, বুক শেলফটাতে কতদিন হাত পড়েনি, ধুলা বালি, হারমোনিয়াম কতকাল ছুয়ে দেখেনি। ভালোই গাইতো একসময়। এখন সময়ই পায়না । শায়লা এখন স্কুলে, ৫টা নাগাদ ছেলে দুটোকে নিয়ে ফিরবে। এরই মাঝে সব শেষ করতে হবে। সব ঝার পোছ করে মিনিট বিশেক এর জন্য বাইরে যেতে হবে। পাড়ার মোড়ের ফুলের দোকান থেকে তাজা ফুল আনতে হবে সাথে অনেকগুলো বেলুন। একটা সারপ্রাইজই হবে, ভাবতেই ভালো লাগছে বড় ছেলেটার চোখ দুটো কেমন হবে। এমনিতেই অল্পতেই ছেলেটার রাজ্যোর বিস্ময়। স্কুল থেকে ফিরে দুনিয়ার বিস্ময় নিয়ে বলবে
 
-বাবা সব তুমি করছ, কখন করছ, কেমনে করছ, কিভাবে করছ হাজারটা প্রশ্ন আর বিস্ময়।
 
সাথে ছোটটাও সুর মেলাবে। বড়টা যা করবে সাথে সাথেই সেও তাই করবে।ছানাদের বিস্ময় ভরা মুখ দেখতে কি যে ভালো লাগে। কি যে শান্তি ছানা দুটোকে অবাক করতে পেরে। ঠিক যেমনটা দুনিয়ার বিস্ময় নিয়ে ০৭/০২/২০১১ তারিখ, বিকেল ৫:২০ মিনিট অপেক্ষা করেছিল বেইলি রোডের মনোয়ারা হসপিটাল এ । বহুদিনের অপেক্ষা বহু দিনের ত্যাগ, তিতিক্ষা, ধৈর্য্য আহ! ভাবা যায়না। পুরো দশটা বছর কি অবর্ণনীয় কষ্ট সেটা সজল আর শায়লার থেকে ভালো কে বুঝবে। বিয়ের দু এক বছর পর্যন্ত ভাবতো ঠিকআছে আর একটু ষ্ট্যাবল হয়ে নিই, একটু ঘুরাফিরা তারপর না হয় বাচ্চা কাচ্চার কথা ভাববে। এখন টোনাটুনির সংসার দুজনে শুধু ঘোরা ফিরা, হঠাৎ রিকশা ভ্রমন। এমনো হয়েছে সারাদিন রিকশায় ঘুরেছে দুজনে। মাঝে মাঝে রিকশা থামিয়ে
 
-মামু লন একলগে খাই
রিকশাআলা একগাল হেসে বলত
-মামা আমারেয়ো ............... থাক লাগবেনা
-আরে কিযে কন মামা কিছ্ছু হবেনা
 
তিনজনে খেয়ে দেয়ে আবার রিকশা চলছেতো চলছে..................................................... রিকশায় বসে সজল শায়লা দুজনে স্বপ্ন বুনে। টুকটাক চিনে বাদাম আর ক্ষনে ক্ষনে শায়লার গগন ফাটানো হাসি। আসে পাশের লোকজন হঠাৎ অবাক হয়ে চায়। আবার ঝরঝর বাদলদিনে দুজন রিকশার হুড ফেলে ভিজতে ভিজতে রমনায়। বেঞ্চিতে বসে বৃষ্টির মধ্যে চা খাওয়া
 
-মামা চা ভিজ্যা গেলেতো ঠান্ডা, কি মজা পান বুঝিনা হি হি হি
- তুইও খা এক কাপ বৃষ্টিতে ভিজাইয়া হা হা হা
-না মামা লস্ হইবো, নিজে খাইলে বেচুম কি হি হি হি
-লস্ হইবো না, তোরে আমি খাওয়াইতাছি মোট তিন কাপের পয়সা দিমু
 
দশ বারো বছরের মেয়েটা অবাক হয়ে বলে
-হায় আল্লাহ কি কয় মামা, আমার চা আমি খামু আবার টেকাও পামু, মামা আফনে না একটা আস্ত পাগল হি হি হি
 
যখনি রমনাতে গেছে কিভাবে জানি এই পুচকে মেয়েটার সাথে দেখা হয়ে যেত। মুখে হাসি লেগেই থাকতো। চায়ের ফ্লাক্স নিয়ে দৌড়ে এসে বলতো
 
-হায় আল্লাহ মামা আফনেরা আইসা পড়ছেন, লন চা খান। মামি আফনেরে মেলা সোন্দর লাগতাছে হি হি হি
 
বিয়ের তিনবছর এমনিই ছিল দৈনন্দিন জীবনাচার। কিন্তু এরপর?
 
-খালি দুজনেই থাকবা।
-কি সমস্যা বাচ্চা কাচ্চা নেসনা ক্যান।
-কোন সমস্যা থাকলে ডাক্তার কবিরাজ দেখা ইত্যাদি..............
 
এটা শুনতে শনতে সজল শায়লার কান ঝালা পালা। কিন্তু দুজনেই ধৈয্যের সাথে অতি সতর্কতার সাথে সব পার করেছে। কারণ যারা প্রশ্নকারী তারাতো অতি নিকট আন্তীয় কিছুতো বলা যায়না। মাঝে মাঝে প্রচন্ড কষ্ট হত তবুয়ো মুখ ফুটে কাউকে কিছু বলতো না। কত ডাক্তার, কবিরাজ, বৈদ্য, হুজুর, মহিলা হুজুর, হোমপ্যাথ -- আহারে সেসব ভাবলে এখনো কষ্ট হয়। এক দুসম্পর্কের খালা বলল তাদের গ্রামে এক মহিলা হুজুর আছে নাম হাজরা হুজুর সে নাকি এক খিলি পান দিবে সেটা খেলে নি:শ্চিত বাইচ্চা, কোন মিস্ নাই। সজল হাসে, শায়লা শাসনের সুরে বলতো
 
-হাসবানা
খালা বলে
 
-ঐ পুলা হাসচ কেন, হাসিস না যেইডা কইলাম কর দেখবি আল্লায় দিব অছিলা অইল ঐ এক খিলি পান বুঝছস।
 
সজলের মা বলেন
- যা না বাপ। কতজনে কত কি করে, কতায় কয় একিনে দরিয়া পার
 
সজল বলতো
-বউ আমার বিশ্বাস নেই এইসবে, তুমি গেলে যাবে আমার আপত্তি নেই।
 
সজল খুব ভালোবাসে শায়লাকে, তাইতো তার মুখের দিকে তাকাতে পারেনা। আহারে কি অসহায়ত্ব, কি যন্ত্রনা। মায়ের জাত বলে কথা একটা সন্তানের আশায় ঢাকা থেকে সেই নোয়াখালীর অজপাড়া  গায়ে শীতের শেষ রাতে চারপাশ বাধানো পুকুরের হীমশিতল পানিতে কোমর সমান নেমে পান খেয়ে আসল................। চারপাশ বাধানো বলতে এটা যে বাইরের কোন পানি ঢুকতে পারবে না এ ধরনের পুকুর। এটা নাকি হাজরা হুজুর স্বপ্নে পেয়েছেন। সেই স্বপ্নে পাওয়া পুকুরে কোমর সমান পানিতে দাড়িয়ে পান খেয়ে আসার পর ধুম জ্বরে পড়ল শায়লা। প্রচন্ড জ্বর আসে.....হাড় কাপুনে জ্বর। সজল হাসে আর বলে
 
-আর যাবা... চিতকার করে গান গায় ..
 
-বধুয়া আমার চোখে জল এনেছে হায় বিনা কারণে
 
শায়লা বিছানায় বেঘোর জ্বরে কাতরায়। সজল রান্না করে ঘর ঘুছায়। খুব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে। সজল কি আসলে স্বাভাবিক? একেক জনের প্রকাশ ভঙ্গী একেক রকম। শায়লা যেরকম চিৎকার করে, হা হা হা করে হাসে, হাউমাউ করে কেঁদে নিজেকে প্রকাশ করে। সজল পারেনা, কাঁদেনা, চিৎকার চেচামেচি করেনা, একেবারে অন্যরকম প্রকাশ। কাউকে বুঝতেই দেয়না ভেতরটা।  অত্যন্ত সর্ন্তপনে বারান্দায় বসে চোখের জল ঝরায়। বারান্দায় রাতের আধারে বসে ভুর ভুর করে সিগারেট টানে। কোথাও কেউ কি নেই, কেউ কি কখনো বাবা বলে ডাকতে আসবেনা। এতদিনে একটা হাহাকার শুরু হয়ে গেছে পরানের গহীনে......................... উত্তরাধিকারের হাহাকার, আঁখি বারি যে বাধা মানেনা, এটা চিরন্তন, এটা সত্যি। না পাওয়ার ব্যাথায় মানুষ কাঁদে। কেঁদে দূকুল ভাসায়, ভেসে যেতে চায় কোন অজানায়। এ কষ্টের শেষটা কোথায় সজল জানেনা। কি করলে শেষ হবে। দু চোখ ছাপিয়ে বুক ভাসে।
 
সেবার টানা ১২ দিন জ্বরে ভুগল বেচারী শায়লা। হাজরা হুজুরের দেয়া সব নিয়ম আচার করল  ভক্তিভরে, কিন্তু কেউ আসলো না মা বলতে, কেউ আসলো না বাবা বলে ডাকতে। ছোট ছোট কচি হাতে কেউ সজলের চোখ দুটো ছুয়ে দিলনা। ফোলা ফোলা ছোট্ট দুটো গাল ধরে টিপে দিতে পারলো না শায়লা আহারে……
 
আরেকবার উত্তরার দক্ষিনখানের এক হুজুরের কাছে গেল দুজনে । আগেরদিন হুজুর ফোনে বলল
 
-১২খান চায়না মাটির পেলেট আইনেন লগে।
 
সাথে সাথে শায়লা সজল দুজনে মৌচাক গিয়ে হুজুরের জন্য চায়না মাটির বারটা প্লেট কিনল। তারপর হুজুরের বাসায়। আমার শায়লাকে দেখেই হুজুর বলল...
 
  • আচর আছে লগে, আচরের লাইগাইতো বাইচ্চা আসেনা
সজল বলে
  • কি বলেন হুজুর এইসব
  • আপনারা শিক্ষীতদের এই এক দুষ এইসবে বিশ্বাস করেন না এইডা ঠিকনা। হুজুর চোখ বন্ধ করে বলতে শুরু করল
  • জানেন হুজুরে পাক (স:) এর জন্য বান মারছে হেই ঘটনাডা জানেন? শোনেন.................................................................................................
 
সজল খুব বিরক্ত হচ্ছে দেখে শায়লা চোখ ইশারা দিল যার মানে –চুপ থাক।
 
সজল চুপ।
 
হুজুর এক বোতল শরিষার তেলের বোতলে তিনবার ফু দিলেন। বান মারার ঘটনা সুর করে বলেই চলছেন।
 
সেই বানে হুজুরে পাক (স:) এর কোন ক্ষতি করতে পারেনাই বলেন ছুবাহান আল্লাহ।
 
সজল আস্তে বলে সুবাহান আল্লাহ।
 
তারপর তিনবার ফু মারা তেল শায়লার সারা মুখ, চোখ, কানে দিলেন। সজল বসে চেয়ে চেয়ে দেখছে, সেকি যন্ত্রনা, কষ্ট, পরান বের হওয়া কষ্ট। তার উপর ধুপ/ধুনোর ধোয়ার সারা ঘর আছ্ছন্ন ধম বন্ধ হবার উপক্রম। শায়লা চিতকার করে কেঁদে উঠল। হুজুর বলল
 
-কাম হইছে .................. যা যা যা বাইর হইয়া যা । দেখছেন কি ছটপট করতাছে, কিছু বুঝতাছেন ভাইজান।
 
প্রায় ১ ঘন্টা পর শায়লাকে নিয়ে বের হল। সাথে ১২ খান পেলেট যাতে জাফরান কালি দিয়া আল্লার নাম/কালাম লিখে দিলেন। আর একটা তাবিজ দিলেন। যা ডান হাত পরিধান করতে হবে।
 
-এক একটা পেলেটে রাইতে পানি দিয়া রাখবেন প্রত্যহ সকালে খালি পেটে পেলেট ধোয় পানি পান করবেন আল্লা সাফি বইলা, ইন শা আল্লাহ কামিয়াবি হবেন।
 
শায়লা নিয়ম করে পেলেট ধোয়া পানি খায়, হাতে তাবিজ পরিধান করেছে যা পরিধানের পূর্বে অতি উত্তমরূপে খাটি গরুর দুগ্ধ ধারা ধৈাত করা হয়েছে। পড়া শরিষার তেল চোখে মুখে মেখে ধুপ/ধুনো জ্বেলে তিব্র ধোয়ার মধ্যে বসে থাকে। শায়লার চোখ ‍দুটো রক্ত জবার মত হয়ে যায়। প্রায় তিনমাস নিষ্ঠাভরে সব নিয়ম কানুন মেনে তেল/পানি মেখে ধুনো/ধুপের ধোয়া খেয়ে আসল। দু চোখ বেয়ে ঝরঝরে বৃষ্টি আসে, তিব্র ধোয়ায় দম বন্ধ হয়ে আসে শায়লার, বমি আসে, চোখ দুটো বের হয়ে আসে। কিন্তু কেউ আসেনা শায়লার ঠোঁট দুটো ছুঁয়ে দিতে, চোখ দুটো ছুয়ে দিতে। সুখের স্রোতে ভাসিয়ে দিতে কেউ আসল না।
 
আরেকবার এক হুজুর নামটা এখন মনে পড়ছে না সজলের, কে যে সে হুজুরের খবর দিল নাহ্ মনেই পড়ছে না। সেই হুজুর একটা শিকড় পড়া দিলেন। সেটা চিটাগাং থেকে কুরিয়ারে পাঠালো। সাথে ব্যবহার পদ্ধতি।
 
 
“উত্তমরূপে চিবাইয়া খাবেন
খাবার সময় পানি বা কোন তরল কিছু খেতে পারবেন না
খাবার শেষে উত্তম রূপে গোসল করবেন
গোসল করা শেষে সোজা নামাজের বিছানায়”
 
বি:দ্র: শিকড় খাবার পর কোন অবস্থাতেই পিছন দিকে তাকাইতে পারিবেন না।
 
হুজুরের নির্দেশ অনুযায়ী শায়লা সেই শিকড় খেয়ে মুখ জিহবা ঘা করে ফেলল................ আহারে সেকি যন্ত্রনা। ডাক্তার বলল কিভাবে হল? সজল ঘটনাটা খুলে বলল।
 
-কি যে বলি আপনাদেরকে আপনারা দুজনেই শিক্ষিত। যাহোক ঔষধ দিয়ে দিলাম ঠিক হযে যাবে।
 
এতকিছুর মাঝে ড: ফরিদা, ড: আনোয়ারা, ড: টি এ চেৌধুরী আরো অনেকের কাছে যায় দুজনে মাসের পর মাস ঔষধ চলছেই। সজলের যাবতীয় টেষ্ট কোনটাই বাদ যায়না। বক্তব্য একটাই কোন সমস্যাই নেই। এসব ক্ষেত্রে নাকি এরকমই হয় কোন কারণ খুজে পাওয়া যায়না। কথা একটাই
- ধৈর্য্য ধরেন ঠিক হয়ে যাবে।
 
এভাবে দিন যায় দিন আস, মাস যায় মাস আসে, বছর যায় বছর আসে কিন্তু কেউ আসেনা সজল শায়লার ছোট্ট খেলনা বাটির ঘরে টুক টুক করে দৌড়াতে কেউ আসেনা।
 
সজলের মনে পড়ছে ২০০৩ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত দুজন কোথাও যেত না। কোন আত্নীয়, পরিজন কিংবা বন্ধু-বান্ধব এর বাসায়। কোন অনুষ্ঠানে, না কোন বিয়ে বাড়ী, জন্মদিন কোথ্থাও না। যেখানেই যায় প্রশ্ন একটাই কার সমস্যা? মনে হয় যেন আর কাজ নেই কারো শুধু তাদের বাচ্চা হয়না কেন এটাই আলোচনার বিষয়। একদিন মগবাজারে সজলের এক বায়রা ভাইয়ের (চাচাত) সাথে দেখা
 
-কি খবর তোমাদের আসনা কেন বাসায়, কোন খবর আছে
 
-না ভাই খবর হলে কি জানাতাম না
-আসলে বলত কার সমস্যা
-সত্যি বলতে কি ভাই সমস্যাটা আমার। বলতে পারিনা মান ইজ্জতে লাগে।বেটা মানুষতো হা হা হা
 
বায়রা ভাই পতপত করে পান খাচ্ছেন আর পুরুত করে রাস্তায় পিক ফেলতে ফেলতে বলেন
 
-অ এই বিষয়
 
এই অ এর মানে সজল বোঝার চেষ্টা করল ......হালা তুমি ত কিছুই পারনা
 
রাতের বেলায় শায়লা বলল
  • মগবাজারের আপা ফোন করেছিল, তুমি দুলাভাইকে কি বলছ
 
-তাহলে কি বলতাম তোমার সমস্যা, সেটা ভালো হতো।
-না আমি তা বলিনি, দুলাভাইকেতো জানো, সবাইকে বলে বেড়াচ্ছে। আমার বুঝি খারাপ লাগেনা।
 
এভাবে দিন গড়ায় নাহ আর কোন ডাক্তার/কবিরাজ/হুজুর/মহিলা হুজুর/আয়ুরবেদ/ইউনানী কিছু না। শায়লা শুধু কাঁদে নামাজের বিছানায়।
 
-আল্লাহ তুমি আমারে সৃষ্টির ধারা থেকে বঞ্চিত করোনা................
 
বুকের মধ্যে কতটা কষ্ট জমাট বাধলে এভাবে দুচোখে স্রোত নামে। তার কষ্ট সজল দেখতে পারেনা সহ্য করতে পারেনা। বুকের সব কটা পাজর মনে হয় একসাথে ঝুরঝুর করে ভেংগে যায়। কিন্তু কিছুই বুঝতে দেয়না।
 
আশাহত হয়ে আবার আশায় বুক বাঁধে এভাবেই সময় যায়। সেপ্টেম্বর ২০১০ রোজার মাস কয়দিন পর ঈদ। ঈদের ছুটিয়ো নেয়া হয়ে গেছে। চার তারিখ সকালের বাসে নোয়াখালী যাবে সজল শায়লা। তিন তারিখ সন্ধ্যে বেলায় শায়লা বলল
 
-আমার খুব খারাপ লাগছে ডাক্তারের কাছে নিয়ে চল। কতদিন থেকে বলছি তোমাকে ডাক্তারের কাছে নেয়ার জন্য তুমি কিছুতো শুনছো না এ বলে গাল ফুলিয়ে বসে রইল।
 
সজল ও এটা লক্ষ্য করেছে কিছুদিন থেকেই শায়লার শরীর খুব খারাপ। ঈদের শপিং করতে গেছে মেৌচাক মার্কেট হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে গেল। সজল বলল
- মনে হয় প্রেশার লো হয়ে গেছে। চল বাসায় চলে যাই।
 
খুব একটা গা করেনাই। মনে মনে ভাবে ফলস্, না কিছুই না, আর কোন আশাই করবো না। কোথায়ো যাবনা কোন ডাক্তারো না, অনেক গেছি। দেখি কি হয়। তার পরও মৌচাক মার্কেটে শায়লার মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়াটা মনে কেমন যেন আশা জাগায়। আশা জাগানিয়া মন নিয়ে  ডাক্তারের কাছে গেল দুজনে। হ্যা ঠিক মনে পড়ছে সজলের এ দিনটা কি ভুলা যায়। ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১০ সন্ধ্যে বেলা । শান্তিনগর এ এক ডাক্তারের চেম্বারে। সব হিষ্ট্রি শুনে ডাক্তার বললেন
 
-কাল সকাল ১০ টার দিকে আসবেন একটা আলট্রসনো করে দেখি।
 
সজল বলল
- ম্যাডাম আমরাতো কাল বাড়ি যাব। ডাক্তার বললেন
- দেখেন এখনি কিছু বলছি না আগে আমি টেষ্টটা করে দেখি। উনার শরীরটা সত্যিাই খারাপ মনে হচ্ছে।
 
একটু হেসে বললেন
-এবার না হয় ঢাকাতেই ঈদ করবেন।
 
পরদিন সকাল ১০টায় ডাক্তারের চেম্বারে। কিছুক্ষন পর ডাক্তারের এসিষ্টেন্ট
-মি: সজল কে, চেম্বারে আসেন।
 
সজল আলট্রাসনো রুমে বসা। ডাক্তার বলে
-আপনি পড়াশুনা করেছেন?
 
সজল ডাক্তারের মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে এ কেমন প্রশ্ন, বোকার মত উত্তর দিচ্ছে যেন কোন ভাইবা দিতে এসছে
 
-জ্বী ম্যাডাম মাষ্টার্স করেছি এমবিএ করেছি, কম্পিউটার ডিপ্লোমা ইত্যাদি ইত্যাদি...........
-আপনার স্ত্রী পড়াশুনা করেনাই
-সে ও মাষ্টার্স করেছে
-ঘোড়ার ডিম করেছে
এই বলে কম্পিউটারের মনিটরটা সজলের দিকে ঘুরিয়ে বলে
-দেখেন আপনাদের বেবি যার বয়স ১৬ সপ্তাহ
সজল কাঁপা কাঁপা গলায় বলল
-ম্যাডাম কি যে বলেন...
-আমার দিকে না মনিটরের দিকে তাকান
সজল দেখছে
-এই যে দেখেন হাত পা নাড়ছে
সজলের হাত পা কাঁপছে।
 
যান বাসায় গিয়ে বউয়ের দেখভাল করেন। সম্পূর্ণ বেড রেষ্ট।
 
আহা শায়লা বেচারী বেডে শুয়ে আছে আর ভেউ ভেউ করে কাদছে।
 
বাসায় এসেই সজলের কি হম্বিতম্বি
-খবরদার বিছানা থেকে নামবে না। সব আমি করব। ঘরের কোন কাজ করবা না।
 
সময় মত অষুধ খাওয়ানো, সপ্তাহে একবার ডাক্তারের কাছে চেকআপ। অত:পর ডাক্তারের দেয়া তারিখ অনুযায়ী ০৭/০২/২০১১ সোমবার মনোয়ারা হসপিটালে সকাল ১১টায় শায়লাকে ভর্তি করা হলো। বিকেল ৫টা ২০ মিনিটে সিজার হলো। সজল অপরেশন থিয়েটারের সামনে অপেক্ষা করছে প্রতিটা মিনিট যেন শেষই হয়না। আয়া কোলে করে নিয়ে এলো, সজল তাকিয়ে রইলো অবাক বিস্ময়ে, কচি কচি আঙ্গুল গুলো ছুয়ে আলতো করে বুকে জড়িয়ে রাখলো কিছুক্ষন। হ্যা বড় বড় শ্বাস নিতে লাগল। এক সময় সজলের মনে হলো দুটো নিশ্বাস এক হয়ে গেছে। সে বলছে –
 
-বাবা আমি এসেছি আমি এসেছি।
ছোট্ট ছোট্ট হাত দুটো, ছোট ছোট আঙ্গুলগুলো ইতস্তত বিক্ষিপ্তভাবে সজলের মুখে, গালে, ঠোঁটে তিরতির করে ছুয়ে যাচ্ছে। আহ্ কচি কচি আঙ্গুলগুলো যেন চাপার কলি, সজল ঘ্রান নিচ্ছে। আয়া বলল
– ভাইয়া অনেক হয়েছে এইবার দেন। মিষ্টি না খাওয়ালে আজ আর দেখতে পাবেন না হি হি হি
 
 
 
এখন সজল শায়লার দুই ছেলে, দুটি লক্ষী ছানা। দেখতে দেখতে ছানাগুলো বড় হয়ে যাচ্ছে, বড় হয়ে যাচ্ছে সজল শায়লার স্বপ্নগুলো। আজ বড় ছানাটার জন্মদিন, তার জন্য এ আয়োজন। সব নিজ হাতে করছে সকাল থেকে। হঠাৎ কলিং বেলের শব্দে সম্বিত ফিরে এল সজলের, আরে এখনো অনেক কাজ বাকী, ওরা চলে এল। নাহ্ বেলুনগুলোও লাগানো শেষ করতে পারলো না। দরজা খুলতেই ছানাগুলো হই হই করে ঘরে ঢুকে পড়ল। বড়টা অবাক হয়ে বড় বড় নিশ্বাস ফেলে আর বলে
-মা দেখ বাবা কি করছে, কত্ত বেলুন সব আমার জন্নো।
ছোট ছেলেটা বলে
- মা দেখো কত্তগুলা ফ্লাওয়ার।
 
ড্রয়িং থেকে ডাইনিং, ডাইনিং থেকে বেড রুম। খাটের নিচ দেখছে দুই ছানা কোথায় কি লুকানো আছে। সজল প্রায় একাজটা করে। কিছু আনলে খাটের নিচে, টেবিলের নিচে লুকিয়ে রাখে আর ছানারা খুজে বের করে। ছানাদের চোখ দুটো আবিস্কারের আনন্দে চক চক করে। বড় ভালো লাগে। শায়লা সজলকে জড়িয়ে ধরে বলে
 
-এসব করার জন্য অফিস কামাই করলে আজ। এবার রেস্ট নাও বাকীটা আমি সামলাবো
 
ছেলে দুটো দৌড়ে এসে
-মা দেখ কত্তগুলা চকলেট খাটের নিচে বাবা লুকাইচে
 
সজল ছানা দুটোকে আর শায়লাকে আরো জোরে জড়িয়ে ধরে। শায়লার চোখে জল চিক চিক করে। সজল আলতো করে চোখের জল মুছে বলে
-উ হু নো কান্নাকাটি, আজ শুধু আনন্দ। বড় ছেলেটার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে
 
-ছানাগুলো দ্রুত বড় হয়ে যাচ্ছে।
 
-হু, ওরা কি সারাজীবন ছোট থাকবে
 
সত্যি ছানাগুলো কত দ্রুত বড় হয়ে যাচ্ছে, সজল চোখ বন্ধ করে দেখতে পাচ্ছে, যেন কালকের কথা । বড় ছেলের জন্ম হলো ০৭/০২/২০১১ তারিখ, হুইল চেয়ারে বসিয়ে অপারেশন থিয়েটারের দিকে নিয়ে যাচ্ছে শায়লাকে। সজল তার হাত ধরে দৌড়াচ্ছে আর ভরসা দিচ্ছে
 
-কিচ্ছু না সোনা তুমি টেরই পাবানা। অপারেশন রুমে ঢুকবা আর বের হবা এর মইধ্যে দেখবা ভ্যা ভ্যা কান্দার শব্দ শুনবা হা হা হা।
 
সেই ছানাটা আজ সাত বছরে পড়ল। আজ বড়ই আনন্দের দিন। সুখের দিন। হঠাৎ করে আজকের দিনটা কেমন যেন অন্যরকম লাগছে। একদমই আলাদা। জীবনটাকে অদ্ভুত সুন্দর লাগছে। প্রত্যেক   মানুষের জীবনে কিছু সুন্দর মুহুর্ত আসে, হঠাৎই আসে, কাল বৈশাখীর ঝড়ের মত। কিছু সময়ের জন্য মনের অলি গলিতে সুখের ঝড় বইয়ে দেয়।
 
পাশের ফ্ল্যাটের নীলা বিকেলের রেওয়াজ করছে, থেকে থেকে ভেসে আসছে।
 
কেমনে রাখি আঁখি বারি চাপিয়া
প্রাতে কোকিল কাঁদে
নিশিথে পাপিয়া
 
ছোট্ট একটা মেয়ে কি অসাধারণ নজরুলগীতি গায়। গান শুনলে বোঝাই যায়না একটা বাচ্চা মেয়ে গাইছে। সত্যিই জীবনটা অসম্ভব রকমের সুন্দর। বেঁচে থাকাটা অনেক আনন্দের। সুখ আর আনন্দের দ্যুতিগুলো শায়লার চোখে মুখে উথলে উথলে পড়ছে। এতক্ষন খেয়ালই করেনি সজল, শায়লা আজ তার পছন্দের নীল শাড়িটা পরেছে যেন পুরো নীল আকাশটা আজ তার ঘরের মাঝে, কপালে নীল টিপ, ঠোঁটে কৃষ্ণচূড়া লাল লিপষ্টিক, বাহ্ কি সুন্দর লাগছে শায়লাকে।
 
নীলার গানের সুরটা আরো চড়া
আমার এ পোড়া আঁখি
জল লুকাবো কত কাজল মাখি মাখি……….
চাপিতে গেলে উঠে দুকূল ছাপিয়া……..
 
ছানা দুটো ঘরময় বেলুন আর ফুল নিয়ে হৈ হৈ করছে। শায়লার কপালের কাঁচ ফোটার টিপ থেকে ঝলমল করে জোছনা ঝরছে। একি সজলের চোখ দুটো জ্বালা করছে কেন? সজলের চোখ দুটো কেমন ভিজে ভিজে আসছে কেন?
 
যাক সব ভিজিয়ে দিয়ে, ভাসিয়ে দিয়ে যাক
এ যে বাধা মানবে না, সজল ইচ্ছে করলেও পারবে না
কেউ পারে না, কখনো পারেনি।

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
উপরে যান