মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্বিচার রোহিঙ্গা-হত্যাকাণ্ডের আলামত

Fri, Feb 9, 2018 3:34 PM

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্বিচার রোহিঙ্গা-হত্যাকাণ্ডের আলামত

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দমনপীড়নের অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের আলামত পেয়েছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স। সেনাবাহিনী জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে ১০ রোহিঙ্গা হত্যাকাণ্ডের স্বীকারোক্তি দিলেও গ্রামবাসীর ওপর ঘটনার দায় চাপাতে চেষ্টা করে। নিহতদের তারা ‘বাঙালি জঙ্গি’ আখ্যা দেয়। সেই ঘটনার অনুসন্ধান চালিয়ে রয়টার্স দেখিয়েছে, ওই ১০ রোহিঙ্গা ছিলেন সাধারণ গ্রামবাসী। ছবি, প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণসহ খোদ সংশ্লিষ্টদের কাছে থেকে পাওয়া বিবরণের ভিত্তিতে এসব কথা জানায় রয়টার্স।

জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গা হত্যাকাণ্ডের স্বীকারোক্তি দেন মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইয়াং। ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে ১০ জন রোহিঙ্গাকে হত্যার কথা স্বীকার করেন তিনি। তবে বরাবরের মতোই তিনি তাদের ‘বাঙালি জঙ্গি’ হিসেবে তাদের আখ্যায়িত করেন। দাবি করেন, গ্রামবাসী তাদের সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করার পর হত্যা করে। তবে রয়টার্সের অনুসন্ধান বলছে, এদের দুজনকে গ্রামবাসী হত্যা করলেও বাকী আটজনকে সেনাবাহিনীই হত্যা করেছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বৌদ্ধ গ্রামবাসীর কাছে পাওয়া ছবি, আর ওই কবর খননের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাবেক এক বৌদ্ধ সেনা সদস্যের কাছে ঘটনার প্রমাণ পেয়েছে তারা। শুক্রবার এক বিশেষ প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞের এই ঘটনাটি তুলে এনেছে রয়টার্স। তারা জানায় কিভাবে সেদিনের এই নৃশংস হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়েছিল।

সেদিনের ঘটনার তিনটি ছবি রয়টার্সকে দেন একজন বৌদ্ধ গ্রামবাসী। ১ সেপ্টেম্বর তাদের আটকের সময়ের একটি ছবি এবং ২ সেপ্টেম্বর দুটি ছবি। একটি হত্যা করার আগের ও একটি পরের।২ সেপ্টেম্বর সকালের একটি ছবিতে দেখা যায়, একসঙ্গে বাঁধা ১০ জন রোহিঙ্গা। কিছুক্ষণ পরই যাদের ঠাঁই হয় গণকবরে। কবর খুঁড়েছে এমন দুজনের বরাত দিয়ে ঘটনাটি নিশ্চিত করে রয়টার্স। রাখাইনের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সাবেক সেনা সদস্য সো চায় বলেন, ‘এক কবরে দশজনের মরদেহ। প্রত্যেককে দুই-তিনবার গুলি করে সেনারা। যখন কবর দেওয়া হচ্ছিল তখনও কারও কারও গোঙানির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল। আর কেউ ততক্ষণে নিশ্বাস ছেড়ে দিয়েছেন।’

এখন পর্যন্ত শুধু নিপীড়নের শিকার রোহিঙ্গাদের কাছ থেকেই বিভীষিকার কথা জানা যাচ্ছিলো। এবার হামলাকারীদের মুখ থেকে শোনা গেল সেই ভয়াবহতার কথা। বৌদ্ধ গ্রামবাসী জানিয়েছেন কিভাবে তারা রোহিঙ্গাদের বাড়িতে আগুন লাগিয়েছেন, হত্যা করেছেন।  প্রথমবারের মতো মিয়ানমারের আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যদের ভেতরে থেকেও এসেছে স্বীকারোক্তি। রয়টার্সকে তারা জানিয়েছেন, সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বেই এই নিধনযজ্ঞ চালানো হয়েছে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা ছবি দেখে প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে পেরেছেন। তাদের পরিবারের অনেক সদস্যও এখন বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। রয়টার্সের দেখানো ছবি দেখে তারা পরিচয় দেন। তাদের কেউ হয়তো জেলে, কেউ দোকানি। দুজন কিশোর ছিল স্কুলছাত্র আর একজন ইসলামি শিক্ষক।
২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ছয় লাখেরও বেশি মানুষ। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এ ঘটনায় খুঁজে পেয়েছে মানবতাবিরোধী অপরাধের আলামত। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন এই ঘটনাকে জাতিগত নিধনযজ্ঞের ‘পাঠ্যপুস্তকীয় উদাহরণ’ আখ্যা দিয়েছে। রাখাইনের সহিংসতাকে জাতিগত নিধন আখ্যা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
উপরে যান