মেয়র আইভীর হস্তক্ষেপে বেঁচে গেল পুকুর, মন্দির, মসজিদ-সহ খেলার মাঠ

Sun, Feb 11, 2018 11:59 PM

মেয়র আইভীর হস্তক্ষেপে বেঁচে গেল পুকুর, মন্দির, মসজিদ-সহ খেলার মাঠ
  • নিতাই বাবুঃ

একসময় নারায়ণগঞ্জ পাট শিল্প ও বস্ত্রশিল্পের জন্য বিখ্যাত ছিল। নারায়ণগঞ্জের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে শীতলক্ষ্ম্যা নদী। শীতলক্ষ্ম্যা নদীর এপারওপার দুইপাড়েই ছিল, সেসময়ের এশিয়ার বিখ্যাত জুট মিলস্, কাপড়ের মিল। সেসব মিলের শ্রমিকদের জন্য মিলের বাউন্ডারির ভেতরে ছিল, পুকুর, হাটবাজার, মন্দির, মসজিদ, স্কুল, খেলার মাঠ। এমনকি, শ্রমিকদের বিনোদনের জন্য মিলের ভেতরে সিনেমাহলও ছিল। শ্রমিকরা যাতে বাইরে গিয়ে সিনেমা না দেখে। যদি বাইরে গিয়ে সিনেমা দেখে, আর যদি কোনও দুর্ঘটনায় কবলিত হয়? সেজন্য মিল মালিকরা শ্রমিকদের জন্য মিলের আওতার ভেতরেই, সবকিছু তৈরি করেছিল। যেমন ছিল, এশিয়ার বিখ্যাত আদমজী জুটমিলে। তেমনি ছিল, ১ নং ঢাকেশ্বরী কটন মিলে, আর ২ নং ঢাকেশ্বরী কটন মিলেও।

শ্রমিকদের জন্য মিল মালিকদের করা ওইসব এখন আর নেই। ওইসব মিল-ই নেই, আর ওইগুলো থাকবে কী করে? তবে এখনো একটা মিলে ওইসব পুরানো নিদর্শন চোখে পড়ে। সেই মিলটি হলো, ১নং ঢাকেশ্বরী কটন মিলস্। বর্তমান নাম, সামছুল আল-আমিন কটন মিলস্। মিলের বাউন্ডারির ভেতরে পুকুরের মাঝখানে এখনো দুইটি জলটুঙি ঠায়  দাঁড়িয়ে আছে। যেই জলটুঙিতে বসে শ্রমিকরা শরীরের ঘাম শুকাইত। ডিউটি থেকে বাইর হয়েই, সোজা জলটুঙিতে গিয়ে বসতো। কেউ আরামে ঘুমিয়ে পড়তো। মস্তবড় পুকুরের মাঝে তিনতলা বিশিষ্ট জলটুঙি ছিল মানুষে নজর কাড়া। পুকুরপাড়েই ছিল শ্রমিকদের জন্য তৈরি করা সিনেমাহল। শমিকদের থাকার বাসস্থানও ছিল, তিনতলা বিশিষ্ট দালান। স্বাধীনতা পরবর্তিতে সেসব মিল ফ্যাক্টরি একসময় মালিকানা থেকে হয়ে যায় জাতীয়করণ।

১৯৮০ দশকের দিকে কিছুকিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান লোকসানি শিল্প্রে পরিণত হয়। ওইরকম পরিস্থিতিতে সরকার মিলগুলো বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সরকারের এমন সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকবছর শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকে। তারপর বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পাবলিকের কাছে লিজ সংক্রান্ত নিয়মাবলীতে লিজ দেওয়া হয়। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয়করণ থেকে হয়ে যায় ব্যক্তিমালিকানাধীন। সরকার থেকে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো লিজ নিয়ে তাঁরা, তাদের মতো করে চালাতে শুরু করে। তারমধ্যে আদমজী জুটমিল হয়ে গেছে, বিশালাকার ইপিজেড। প্রতিষ্ঠানগুলো লিজ নিয়ে, কেউ মিলের ভেতরে থাকা পুকুর রাখছে, কেউ পুকুর ভরাট করে পুকুরের জায়গায় স্থাপনা নির্মাণ করছে। কেউ খেলার মাঠ রাখছে, কেউ রাখছে না। বর্তমানে এভাবেই চলছে, আগের কাপড়ের মিলগুলো। আর পরিবর্তনও হচ্ছে, শীতলক্ষ্ম্যা নদীর পাড়ের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জায়গা।

ওইসব পুরানো মিল ফ্যাক্টরিগুলোর মধ্যে চিত্তরঞ্জন, লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিলের ভেতরেও পুকুর আছে। যা বর্তমানে এলাকার মানুষেই বেশি ব্যবহার করছে। কারণ, মিল অনেক বছর ধরে বন্ধ তাই। চিত্তরঞ্জন মিলের পুকুরটি বিশাল বড়। এটিকে পুরানোদিনের দীঘিও বলা চলে। আমার বাবা চাকরি করতেন, চিত্তরঞ্জন কটন মিলে। ছোটবেলা  নদী পার হয়ে বাবার সাথে দেখা করতে আসতাম। বাবার সাথে দেখা করে বাসায় ফেরার আগে, পুকুরপাড়ে গিয়ে কিছুক্ষণ ঘুরাঘুরি করতাম। আর এখনতো এই পুকুরটির সামনেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছি। তাও অনেক বছর হয়ে গেল। এলাকার শত মানুষের সাথে নিজেরও এই পুকুরটিতে স্নান করতে হয়। এই পুকুরটি গোদনাইল এলাকাবাসীর স্নান করা সহ ধোয়ামোছার জন্য একমাত্র উপায়। বর্তমানে গোদনাইল আরামবাগ এলাকায় এই পুকুরটি ছড়া, দ্বিতীয় পুকুর আর নেই। যা-ও একটা আছে, সেটা লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিলের ভেতরে। সেই পুকুরটি আরামবাগ এলাকা থেকে একটু দূরে। তাই কেউ আর সেই পুকুরে যায় না। চিত্তরঞ্জন কটন মিলের পুকুরটিই আরামবাগ এলাকার মানুষের কাছে প্রিয় পুকুর।

ইদানীংকালে বিটিএমসি (বাংলাদেশ টেক্সটাইল মার্কেটিং সংস্থা) চিত্তরঞ্জন কটন মিলের পুরো জায়গা প্লট আকারে বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ঘোষণা দেওয়া হয়, পল্লী টেক্সটাইল স্থাপনের লক্ষ্যে সুলভ মূল্যে প্লট বিক্রি করা হবে। সেই লক্ষ্যে মিলের মোট জায়গা দশভাগে দশটি প্লট করেছে। এসব প্লটের আওতার মধ্যে রয়েছে পুকুর, মসজিদ, মন্দির, স্কুল ও খেলার মাঠ। প্লট বিক্রির ঘোষণা দেওয়ার পরপর, মিল অভ্যন্তরে বসবাস করা মানুষকে নোটিশ দেওয়া হয়। বসবাসকারীরা নোটিশ পেয়ে মিলের বাসা ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়। তারপর শুরু হয় মিল কর্তৃপক্ষের প্লট নির্ধারণের সীমানা পিলার গাথার কাজ। পুকুরটিও হছে দুটি প্লট। পুকুরের মাঝামাঝি এপারওপারে সীমানা পিলার গাথা। পিলার দেখে এলাকার মানুষের মুখে শুধু হায় হায়। পুকুর যদি ভরাট করে ফেলে, স্নান সহ ধোয়ামোছা করবে কোথায়। এলাকার মানুষের চিন্তা ছিল শুধু এটাই।

বর্তমানে শীতলক্ষ্ম্যা নদীতেও স্নান করা যায় না। নদীর পানিতে বিষাক্ত কেমিক্যাল মিশ্রিত। নদীর পানি দেখা যায় কালো কুচকুচে রঙের মতন। সাথে পশু মরা দুর্গন্ধ। এমন পানিতে স্নানতো দূরের কথা, মানুষ পা ভেজাতেও ভয় পায়। এমতাবস্থায় যদি মিল কর্তৃপক্ষ পুকুরটি ভরাট করে ফেলে, এলাকার মানুষের হবে দুরাবস্থা। পুকুরের সাথে সাথে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে, মসজিদ আর মন্দির কমিটি। কারণ, মসজিদ, মন্দির, স্কুলও ওই প্লট নির্ধারিত সীমানার আওতাভুক্ত। পুকুরটির পাড় ঘেঁষেই মন্দির, মসজিদ ও স্কুল। স্কুলের পাশের সুবিশাল ফুটবল খেলার মাঠ। তাই এলাকার মানুষ একপ্রকার দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এরমধ্যের মিল কর্তৃপক্ষ পুকুর ভরাট করার জন্য কয়েকবার সিদ্ধান্ত নেয়। এতে এলাকার কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ জানায়। তখন মিল কর্তৃপক্ষ মানুষের বাধার করণে আর পুকুর ভরাট করতে পারেনি। কিন্তু মিল কর্তৃপক্ষ পুকুর ভরাট করার চেষ্টা অব্যাহত রাখে। এই খবর পৌঁছে যায় নারায়ণগঞ্জ সিটি মেয়র আইভীর কাছে।

খবর পেয়ে সম্মানিত মেয়র আইভী নগর ভবনে আর বসে থাকতে পাড়লেন না। তিনি বসে থাকার মানুষও না। কারণ তিনি নারায়ণগঞ্জবাসীর হৃদয়ের মানুষ। নারায়ণগঞ্জের উন্নয়নই যার দুনয়নে থাকা স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন দিনেদিনেই বাস্তবায়ন করে চলছে, সম্মানিত সিটি মেয়র আইভী। তিনি সেই প্রাচ্যের ডান্ডি নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান, প্রয়াত আলী আহম্মদ চুনকা সাহেবের মেয়ে। নারায়ণগঞ্জের অগ্নিকন্যা আর উন্নয়নের মানসকন্যা যাকে বলা হয়। মানুষের দুঃখ দুর্দশা আর নগর উন্নয়নই যার কাছে মুখ্য বিষয়, তিনিই হলেন ডা: সেলিনা হায়াৎ আইভী। যার উন্নয়নের ছোঁয়ার আজ প্রাচ্যের ডান্ডি নারায়ণগঞ্জ নবরূপে সজ্জিত।

একদিন সম্মানিত মেয়র একদিন চিত্তরঞ্জন পুকুরপাড় আসলেন। তাঁর সাথে ছিলেন, ১০নং ওয়ার্ডের দুইজন কমিশনার। একজন আল-হাজ্ব ইপতেখার আলম খোকন। আরেকজন আল-হাজ্ব মিনোয়ারা বেগম মিনা(১০,১১,১২) মহিলা কমিশনার। মেয়র আইভীর আগমনে সেখানে হাজির হলেন, এলাকার শতশত মানুষ। আসলেন চিত্তরঞ্জন কটন মিলের দায়িত্বে থাকা ম্যানেজারও। সবাইকে সাথে নিয়ে পুকুরের চারদিক ঘুরে দেখলেন। ঘোষণা দিলেন, 'আজ থেকে এই পুকুর এলাকার জনগণের। পুকুরপাড়ে থাকা মন্দির, মসজিদ, স্কুল, খেলার মাঠও জনগণের।'

মিল কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্যে বললেন, "আপনারা যা-ই করতে চান করুন। কিন্তু পুকুর, মন্দির, মসজিদ, স্কুল ও খেলার মাঠ নিয়ে মাথা ঘামাবেন না। এগুলো বাদ রেখে যা খুশি তা করুন, কেউ আপনাদের বাধা দিবে না। কেউ প্রতিবাদ করবে না, কেউ অভিযোগও করবে না। এমনিতেই সিটি কর্পোরেশনের আওতায় পরিত্যক্ত জায়গা খুবই কম। ছোটখাটো একটু জায়গায় একটা স্থাপনা নির্মাণ করা সম্ভব। কিন্তু নতুন করে একটা পুকুর খনন করা সম্ভব নয়। আর একটা খেলার মাঠের মতন বিশাল জায়গা করে দেওয়াও সম্ভব নয়। কাজেই এগূলো যেভাবে আছে ঠিক সেভাবে থাকবে। এগুলোর দিকে হাত বাড়াবেন না। এই পুকুরের দায়দায়িত্ব আজ থেকে আমার তথা জনগণের। পুকুরের চারিপাশ সিটি কর্পোরেশনের অর্থায়নে বাধাই করা হবে। প্রতি বিশ গজ অন্তর অন্তর লাইট পোষ্ট থাকবে। থাকবে মানুষের বসার পাকা টেবিল। দু'পাড়ে দুটি সিঁড়ি ঘাটলা মেরামত করা হবে, যাতে এলাকার মানুষ সুন্দরভাবে স্নান সহ ধোয়ামোছার কাজ করতে পারে।" যেদিন থেকে সম্মানিত মেয়র আইভী ঘোষণা দিয়ে গেলেন, তার কিছুদিন পরই শুরু হয় পুকুরপাড় মেরামতের কাজ।

ধারনা করা যায়, আর কিছুদিন পরই পুকুরপাড় পুনঃনির্মানেরকাজ শেষ হবে। পুকুরের দক্ষিণপাড়ে আগেই ছিল পাকা রাস্তা। পূর্ব-পশ্চিম উত্তরপাড় বাধাই হয়ে গেছে। দুটি রিকশা আসাযাওয়া করতে পারে এমন চওড়া রাস্তা। রাস্তায় বসানো হয়েছে একপ্রকার টাইলের মতন ইট। লাগানো হয়েছে রাস্তার দুইপাশে নানারকম পাতাবাহার গাছ। মাঝেমাঝে মানুষ বসার টেবিল, আর লাইট পোস্ট। মোটকথা সম্মানিত মেয়র আইভীর হস্তক্ষেপে পুকুর, মন্দির, মসজিদ, আর খেলার মাঠ খুঁজে পেলো নতুন জীবন। বেঁচে থাকুক সম্মানিত মেয়র আইভী, স্বপ্নপূরণ হোক এলাকার মানুষের।

নিতাই বাবু
গোদনাইল, সিদ্ধিরগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ
১০/০২/২০১৮ইং


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
উপরে যান